মিথ

চাণক্য-শ্লোক : মো. আবুল হোসেন

abul_shib_1243143636_1-চাণক্য

‘চাণক্য’ প্রাচীন ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নাম। পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্গত তশীলায় চণক-ঋষির ঔরসে মহামতি চাণক্য খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন। চণক-ঋষির পুত্র বলেই তাঁর নাম হয় ‘চাণক্য’। তাঁর জন্মগ্রাম ‘চানকা’ থেকে ‘চাণক্য’ নাম হয়েছে বলেও অনুমান করা হয়। এছাড়া ‘বিষ্ণুগুপ্ত’ নামেও তিনি পরিচিত। চাণক্যের বিখ্যাত ছদ্মনাম ‘কৌটিল্য’। কুটিলবুদ্ধি পরায়ণ বলে তিনি এ নামে অভিহিত। ‘কুটিলা’ গোত্রভুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর ‘কৌটিল্য’ নাম হয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।
সে সময়ে মগধে ‘নন্দবংশ’ নামে এক রাজবংশ ছিল। ঐ রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন ধনানন্দ। ধনানন্দের সৎভাই ছিলেন (পিতা মহাপদ্মের ঔরসে দাসী ‘মুরা’র গর্ভজাত) চন্দ্রগুপ্ত। রাজা ধনানন্দ প্রজাদের কাছে প্রিয় ছিলেন না। পিতা মহাপদ্মের মৃত্যুর পর তিনি দাসীমাতা মুরা ও সৎভাই চন্দ্রগুপ্তকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেন। অপমানিত চন্দ্রগুপ্ত তার ভাই ধনানন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু সে চেষ্টায় তিনি ব্যর্থ হন এবং জীবন বাঁচাতে জঙ্গলে গিয়ে নির্বাসিত জীবন-যাপন করতে থাকেন।
মহারাজ ধনানন্দের পিতৃশ্রাদ্ধে পৌরহিত্য করার জন্য একজন ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয়। ব্রাহ্মণ সংগ্রহের দায়িত্ব পড়ে মন্ত্রী শকটার উপর। তিনি চাণক্যকে মহারাজ ধনানন্দের পিতৃশ্রাদ্ধে পৌরহিত্য করার অনুরোধ জানান। সে অনুরোধ অনুযায়ী চাণক্য যথাসময়ে রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হয়ে পুরোহিতের আসন গ্রহণ করেন। চাণক্যের চেহারা খুব ভাল ছিল না। পুরোহিতের আসনে কদাকার ব্রাহ্মণ চাণক্যকে দেখে মহারাজ ধনানন্দ ভীষণ ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে তিরস্কার করে সেখান থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। পণ্ডিত চাণক্য প্রথমে রুষ্ট না হয়ে মহারাজাকে হিতবাক্যে বুঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজা ধনানন্দ কোন প্রবোধ না মেনে অপর লোক দ্বারা চাণক্যকে যথেষ্ট অপমান করেন। চাণক্য ক্রুদ্ধ হয়ে সেখান থেকে চলে আসেন এবং এই অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিজ্ঞা করেন।
চন্দ্রগুপ্ত যখন বিন্ধানের জঙ্গলে পলাতক ও নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন, তখন ঘটনাচক্রে ঐ চাণক্যের সাথে তার সাক্ষাত হয়। চন্দ্রগুপ্ত তার সমস্ত কথা চাণক্যের কাছে খুলে বলেন এবং ধনানন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন দখলে চাণক্যের পরামর্শ ও সাহায্য কামনা করেন। চাণক্য ছিলেন প্রখর প্রতিভাধর কুটিলবুদ্ধি-সম্পন্ন পণ্ডিত। চন্দ্রগুপ্ত চাণক্যকে তার গুরু, উপদেষ্টা ও মন্ত্রণাদাতা হিসেবে মেনে নেন। চাণক্যের সক্রিয় সহযোগিতায় চন্দ্রগুপ্ত ক্রমে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং গুরু চাণক্যের সুনিপুণ পরিকল্পনা অনুসারে ধনানন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন দখল করেন। সিংহাসনে আরোহন করার পর মাতা ‘মুরা’র নামানুসারে (নন্দবংশের পরিবর্তে) রাজবংশের নামকরণ করেন ‘মৌর্যবংশ’ এবং পণ্ডিত চাণক্যকে করেন তার রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী।
চন্দ্রগুপ্তের গুরু ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাণক্য অবলীলায় বিলাসবহুল জীবন কাটাতে পারতেন জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে। কিন্তু তিনি তা না করে একটি শ্মশানে কুড়েঘরে সন্ন্যাসীর মত জীবন-যাপন করতেন। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের চেহারা যেমন সুন্দর ছিল না, চাণক্যের চেহারাও তেমনি সুন্দর বা আকর্ষণীয় ছিল না। তাছাড়া স্বাস্থ্যেও তিনি ছিলেন দুর্বল। কিন্তু পাণ্ডিত্যে ছিলেন প্রায় সক্রেটিসের সমতুল্য। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।’ তিনি ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ, সিদ্ধান্তে অটল এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অত্যন্ত কঠোর। ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে দূরে থেকেও তিনি সর্ববিধ পরামর্শ দিয়ে রাজা চন্দ্রগুপ্তকে পরিচালনা করতেন। রাজা চন্দ্রগুপ্তের জীবনে চাণক্য ছিলেন সত্যিকার বন্ধু, দার্শনিক, গুরু এবং স্বর্গীয় দূততুল্য অভিভাবক। শ্মশানে থেকে (রাজ্য পরিচালনার পরামর্শদানের পাশাপাশি) অসংখ্য ভক্তদেরকে নৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বিষয়েও তিনি জ্ঞানদান করতেন।
চাণক্যের অর্থবিষয়ক জ্ঞানের সংকলন হচ্ছে অর্থশাস্ত্র, যা ‌’চাণক্যের অর্থশাস্ত্র’ নামে পরিচিত একটি কালোত্তীর্ণ গ্রন্থ। এ শাস্ত্রে আছে শাসকের উদ্দেশ্যে পরামর্শ, প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবনমান উন্নতকরার কৌশল। চাণক্য তার অর্থশাস্ত্রে রাজাকে এভাবে পরামর্শ দিয়েছেন- ‘যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করা উচিত।’ ‘সকল উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের উপর। সে জন্য সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেওয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুপ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বার ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুর আস্বাদন করা সম্ভব নয়, তেমনি কোন রাজকর্মচারীর পক্ষে রাজার রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না-খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। পানির নিচের মাছের গতিবিধি বোঝা যেমন অসম্ভব, রাজকর্মচারীর তহবিল তসরুপ বোঝাও তেমনি অসম্ভব। আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজকর্মচারীর গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব।’ চাণক্যের পরামর্শ ও নির্দেশনাগুলি শুধু রাজ্যশাসনের ক্ষেত্রে নয়, এ যুগের বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনিই অর্থশাস্ত্রের প্রথম প্রবক্তা বলে অভিহিত। চাণক্যের অর্থশাস্ত্র উপবেদের অন্তর্ভুক্ত।
এই বিজ্ঞ ও বাস্তবজ্ঞান-সম্পন্ন পণ্ডিতের সমাজ, সংসার, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কিত নীতিকথাগুলি (আজ আড়াই হাজার বছর পরেও) গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেনি। আজও তা ‘চাণক্য-শ্লোক’ নামে ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। কথাগুলি যে চাণক্যের তা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না, অথচ কথাগুলি আমাদের খুবই পরিচিত। চাণক্যের এমন কিছু শ্লোক নিচে উল্লেখ করা হল-

১. অতি পরিচয়ে দোষ আর ঢাকা থাকে না।
২. অধমেরা ধন চায়, মধ্যমেরা ধন ও মান চায়। উত্তমেরা শুধু মান চায়। মানই মহতের ধন।
৩. অনেকে চারটি বেদ এবং ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেও আত্মাকে জানে না, হাতা যেমন রন্ধন-রস জানে না।
৪. অন্তঃসার শূন্যদের উপদেশ দিয়ে কিছু ফল হয় না, মলয়-পর্বতের সংসর্গে বাঁশ চন্দনে পরিণত হয় না।
৫. অবহেলায় কর্মনাশ হয়, যথেচ্ছ ভোজনে কুলনাশ হয়, যাচ্ঞায় সম্মান-নাশ হয়, দারিদ্র্যে বুদ্ধিনাশ হয়।
৬. অভ্যাসহীন বিদ্যা, অজীর্ণে ভোজন, দরিদ্রের সভায় বা মজলিশে কালক্ষেপ এবং বৃদ্ধের তরুণী ভার্যা বিষতুল্য।
৭. অহংকারের মত শত্রু নেই।
৮. আকাশে উড়ন্ত পাখির গতিও জানা যায়, কিন্তু প্রচ্ছন্নপ্রকৃতি-কর্মীর গতিবিধি জানা সম্ভব নয়।
৯. আদর দেওয়ার অনেক দোষ, শাসন করার অনেক গুণ, তাই পুত্র ও শিষ্যকে শাসন করাই দরকার, আদর দেওয়া নয়।
১০. আপদের নিশ্চিত পথ হল ইন্দ্রিয়গুলির অসংযম, তাদের জয় করা হল সম্পদের পথ, যার যেটি ঈপ্সিত সে সেই পথেই যায়।
১১. আড়ালে কাজের বিঘ্ন ঘটায়, কিন্তু সামনে ভাল কথা বলে, যার উপরে মধু কিন্তু অন্তরে বিষ, তাকে পরিত্যাগ করা উচিত।
১২. ইন্দ্রিয়ের যে অধীন তার চতুরঙ্গ সেনা থাকলেও সে বিনষ্ট হয়।
১৩. উপায়জ্ঞ মানুষের কাছে দুঃসাধ্য কাজও সহজসাধ্য।
১৪. উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষে, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামকালে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে সঙ্গে থাকে, সে-ই প্রকৃত বন্ধু।
১৫. ঋণ, অগ্নি ও ব্যাধির শেষ রাখতে নেই, কারণ তারা আবার বেড়ে যেতে পারে।
১৬. একটি দোষ বহু গুণকেও গ্রাস করে।
১৭. একটি কুবৃক্ষের কোটরের আগুন থেকে যেমন সমস্ত বন ভস্মীভূত হয়, তেমনি একটি কুপুত্রের দ্বারাও বংশ দগ্ধ হয়।
১৮. একটিমাত্র পুষ্পিত সুগন্ধ বৃক্ষে যেমন সমস্ত বন সুবাসিত হয়, তেমনি একটি সুপুত্রের দ্বারা সমস্ত কুল ধন্য হয়।
১৯. একশত মূর্খ পুত্রের চেয়ে একটি গুণী পুত্র বরং ভাল। একটি চন্দ্রই অন্ধকার দূর করে, সকল তারা মিলেও তা পারে না।
২০. কর্কশ কথা অগ্নিদাহের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
২১. খেয়ে যার হজম হয়, ব্যাধি তার দূরে রয়।
২২. গুণবানকে আশ্রয় দিলে নির্গুণও গুণী হয়।
২৩. গুণহীন মানুষ যদি উচ্চ বংশেও জন্মায় তাতে কিছু আসে যায় না। নীচকুলে জন্মেও যদি কেউ শাস্ত্রজ্ঞ হয়, তবে দেবতারাও তাঁকে সম্মান করেন।
২৪. গুরু শিষ্যকে যদি একটি অক্ষরও শিক্ষা দেন, তবে পৃথিবীতে এমন কোনও জিনিস নেই, যা দিয়ে সেই শিষ্য গুরুর ঋণ শোধ করতে পারে।
২৫. গৃহে যার মা নেই, স্ত্রী যার দুর্মুখ তার বনে যাওয়াই ভাল, কারণ তার কাছে বন আর গৃহে কোনও তফাৎ নেই।
২৬. চন্দন তরুকে ছেদন করলেও সে সুগন্ধ ত্যাগ করে না, যন্ত্রে ইক্ষু নিষ্পিষ্ট হলেও মধুরতা ত্যাগ করে না, যে সদ্বংশজাত অবস্থা বিপর্যয়েও সে চরিত্রগুণ ত্যাগ করে না।
২৭. তিনটি বিষয়ে সন্তোষ বিধেয়: নিজের পত্নীতে, ভোজনে এবং ধনে। কিন্তু অধ্যয়ন, জপ, আর দান এই তিন বিষয়ে যেন কোনও সন্তোষ না থাকে।
২৮. দারিদ্র্য, রোগ, দুঃখ, বন্ধন এবং বিপদ- সব কিছুই মানুষের নিজেরই অপরাধরূপ বৃক্ষের ফল।
২৯. দুর্জনের সংসর্গ ত্যাগ করে সজ্জনের সঙ্গ করবে। অহোরাত্র পুণ্য করবে, সর্বদা নশ্বরতার কথা মনে রাখবে।
৩০.দুর্বলের বল রাজা, শিশুর বল কান্না, মূর্খের বল নীরবতা, চোরের মিথ্যাই বল।
৩১.দুষ্টা স্ত্রী, প্রবঞ্চক বন্ধু, দুর্মুখ ভৃত্য এবং সসর্প-গৃহে বাস মৃত্যুর দ্বার, এ-বিষয়ে সংশয় নেই।
৩২. ধর্মের চেয়ে ব্যবহারই বড়।
৩৩. নানাভাবে শিক্ষা পেলেও দুর্জন সাধু হয় না, নিমগাছ যেমন আমূল জলসিক্ত করে কিংবা দুধে ভিজিয়ে রাখলেও কখনও মধুর হয় না।
৩৪. পরস্ত্রীকে যে মায়ের মত দেখে, অন্যের জিনিসকে যে মূল্যহীন মনে করে এবং সকল জীবকে যে নিজের মত মনে করে, সে-ই যথার্থ জ্ঞানী।
৩৫. পাপীরা বিক্ষোভের ভয় করে না।
৩৬. পাঁচ বছর বয়স অবধি পুত্রদের লালন করবে, দশ বছর অবধি তাদের চালনা করবে, ষোল বছরে পড়লে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মত আচরণ করবে।
৩৭. পুত্র যদি হয় গুণবান, পিতামাতার কাছে তা স্বর্গ সমান।
৩৮. পুত্রকে যাঁরা পড়ান না, সেই পিতামাতা তার শত্রু। হাঁসদের মধ্যে বক যেমন শোভা পায় না, সভার মধ্যে সেই মূর্খও তেমনি শোভা পায় না।
৩৯. বইয়ে থাকা বিদ্যা, পরের হাতে থাকা ধন একই রকম। প্রয়োজনকালে তা বিদ্যাই নয়, ধনই নয়।
৪০. বিদ্বান সকল গুণের আধার, অজ্ঞ সকল দোষের আকর। তাই হাজার মূর্খের চেয়ে একজন বিদ্বান অনেক কাম্য।
৪১. বিদ্যাবত্তা ও রাজপদ এ-দুটি কখনও সমান হয় না। রাজা কেবল নিজদেশেই সমাদৃত, বিদ্বান সর্বত্র সমাদৃত।
৪২. বিদ্যা ব্যতীত জীবন ব্যর্থ, কুকুরের লেজ যেমন ব্যর্থ, তা দিয়ে সে গুহ্য-অঙ্গও গোপন করতে পারে না, মশাও তাড়াতে পারে না।
৪৩. বিদ্যাভূষিত হলেও দুর্জনকে ত্যাগ করবে, মণিভূষিত হলেও সাপ কি ভয়ঙ্কর নয়?
৪৪. বিদ্যার চেয়ে বন্ধু নাই, ব্যাধির চেয়ে শত্রু নাই। সন্তানের চেয়ে স্নেহপাত্র নাই, দৈবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বল নাই।
৪৫. বিনয়ই সকলের ভূষণ।
৪৬. বিষ থেকেও অমৃত আহরণ করা চলে, মলাদি থেকেও স্বর্ণ আহরণ করা যায়, নীচজাতি থেকেও বিদ্যা আহরণ করা যায়, নীচকুল থেকেও স্ত্রীরত্ন গ্রহণ করা যায়।
৪৭. ভোগবাসনায় বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়।
৪৮. মিত ভোজনেই স্বাস্থ্যলাভ হয়।
৪৯. যশবানের বিনাশ নেই।
৫০. যাঁরা রূপযৌবনসম্পন্ন এবং উচ্চকুলজাত হয়েও বিদ্যাহীন, তাঁরা সুবাসহীন পলাশ ফুলের মত বেমানান।
৫১. যে অলস, অলব্ধ-লাভ তার হয় না।
৫২. যে গাভি দুধ দেয় না, গর্ভ ধারণও করে না, সে গাভি দিয়ে কী হবে! যে বিদ্বান ও ভক্তিমান নয়, সে পুত্র দিয়ে কী হবে!
৫৩. রাতের ভূষণ চাঁদ, নারীর ভূষণ পতি, পৃথিবীর ভূষণ রাজা, কিন্তু বিদ্যা সবার ভূষণ।
৫৪. শাস্ত্র অনন্ত, বিদ্যাও প্রচুর। সময় অল্প অথচ বিঘ্ন অনেক। তাই যা সারভূত তারই চর্চা করা উচিত। হাঁস যেমন জল-মিশ্রিত দুধ থেকে শুধু দুধটুকুই তুলে নেয়, তেমনি।
৫৫. সত্যনিষ্ঠ লোকের অপ্রাপ্য কিছুই নাই।
৫৬. সত্যবাক্য দুর্লভ, হিতকারী-পুত্র দুর্লভ, সমমনস্কা-পত্নী দুর্লভ, প্রিয়স্বজনও তেমনি দুর্লভ।
৫৭. সাপ নিষ্ঠুর খলও নিষ্ঠুর, কিন্তু সাপের চেয়ে খল বেশি নিষ্ঠুর। সাপকে মন্ত্র বা ওষধি দিয়ে বশ করা যায়, কিন্তু খলকে কে বশ করতে পারে?
৫৮. সুবেশভূষিত মূর্খকে দূর থেকেই দেখতে ভাল, যতক্ষণ সে কথা না বলে ততক্ষণই তার শোভা, কথা বললেই মূর্খতা প্রকাশ পায়।
৫৯. হাতি থেকে একহাজার হাত দূরে, ঘোড়া থেকে একশ হাত দূরে, শৃঙ্গধারী প্রাণী থেকে দশহাত দূরে থাকবে। অনুরূপ দুর্জনের কাছ থেকেও যথাসম্ভব দূরে থাকবে।

# মো. আবুল হোসেন : ব্লগার

।।–ইকারাস এবং ডিডেলাস: আকাশ  ছোঁয়ার স্বপ্ন–।।

– ইনকগনিটো

গ্রীক মিথগুলোর মধ্যে বেশ জনপ্রিয় দুইটি চরিত্র ইকারাস ও ডিডেলাস। যদিও ইকারাসের পরিনতি অনেক করুন , তবুও তার ঘটনাটি বেশ বিখ্যাত।

ইকারাস ছিল ডিডেলাস এর একমাত্র ছেলে। ডিডেলাস ছিলেন এথেন্স এর বিখ্যাত এক চরিত্র। তিনি একাধারে ছিলেন স্থপতি , ভাস্কর ও আবিস্কারক। বলা হয়ে থাকে, ডিডেলাসের তৈরি মূর্তি গুলো এতোটাই জীবন্ত ছিল ,যে তাদের সুতো দিয়ে বেধে রাখতে হতো ,যাতে চলাচল না করতে পারে। ডিডেলাসের সহকারী ছিল ট্যালোস। ট্যালোস ছিল ডিডেলাসের বোনের পুত্র , যার মেধা তাকে খুব অল্প সময়েই পৌঁছে দিয়েছিল সাফল্ল্যের শিখরে। অসামান্য এক প্রতিভার পরিচয় পেলেন ডিডেলাস। শিকারের সময় একটি সাপের দন্তচালনা দেখে ,অথবা বড় মাছের পিঠের শক্ত কাটার মাধ্যমে ধারনা নিয়ে সে আবিস্কার করলো এক আশ্চর্য করাত,যা দেখে ডিডেলাস ও হয়ে উঠলো ঈর্ষান্বিত। পাছে শিষ্য তার গুরুকে অতিক্রম করে বসে , এই কুচিন্তায় ডিডেলাস এক উঁচু পাথরের উপর থেকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে ট্যালোস কে হত্যা করেন।

ডিডেলাসের এই অপকর্মের জন্য তাকে এথেন্স ছাড়তে বাধ্য করা হল । ডিডেলাসকে পাঠানো হল ক্রীট দ্বীপে ,রাজা মাইনস এর অধীনে কাজ করার জন্য।

কোন এক সময় রাজা মাইনসের কাছে দৈববাণী এলো সমুদ্রের রাজা পসেডিওন এর উদ্দেশ্যে একটি ষাঁড় উৎসর্গ করার। সমুদ্র থেকেই একটি ধবধবে সাদা সুন্দর ষাঁড় উঠে আসলো ক্রীট দ্বীপে। ষাঁড়টি এতোটাই সুন্দর ছিল যে রাজা দেবতাদের আদেশ অমান্য করলেন। তিনি ষাঁড়টাকে নিজের কাছেই রাখতে চাইলেন। এতে সমুদ্র দেবতা পসেডিওন চরম ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি রাজাকে শাস্তি দিলেন তার রানীর মাধ্যমে যেখানে রানী প্যাসিফার অন্তরে এই ষাঁড়টির জন্য গভীর প্রেম সৃষ্টি হল ।
এমনকি এই ষাঁড়ের সাথে রানী প্যাসিফার মিলনও হল।

প্যাসিফার গর্ভে জন্ম নিল এমন এক সন্তান , যার অর্ধাঙ্গ মানুষের , এবং অর্ধাঙ্গ ষাঁড়ের। তার নাম মিনোটর।

মাইনস এই ঘটনায় চরম ভাবে লজ্জিত ও অপমানিত হলেন। তিনি মিনোটর নামক জন্তুটিকে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলতে চাইলেন। তিনি ডিডেলাসকে আদেশ দিলেন এমন এক ল্যাবিরিন্থ বা গোলকধাঁধা নির্মাণের যার মাধ্যমে তিনি বন্দী করে ফেলতে পারবেন এই দানবকে , এবং কখনোই সে পালাতে সক্ষম হবে না।

ডিডেলাস মাইনসের কথা অনুসারে একটা ল্যাবিরিন্থ তৈরি করলেন। যার প্রবেশপথ ছিল মাত্র একটি। এটি এতোটাই জটিল ছিল ,যে কেউ ঢুকলে আর বের হওয়া সম্ভব ছিল না।

মিনোটর এর খাদ্যবস্তু ছিল মানুষ । ক্রীট এর সাথে এথেন্সের যুদ্ধে এথেন্সের পরাজয়ের কারনে এথেন্স থেকে প্রতিবছর ক্রীট দ্বীপে কিছু দুর্ভাগ্যবান মানব ও মানবী পাঠানো হতো । তারাই পরিনত হতো মিনোটর এর খাদ্যবস্তু।

কোন এক বছরে এথেন্স থেকে বন্দী হয়ে এলেন থিসিউস । থিসিউস ছিলেন এথেন্সের এক বীর । থিসিউস কে দেখে ক্রীট রাজকন্যা অ্যারিয়াডেন থিসিউসের প্রেমে পড়ে। সে ডিডেলাসকে কাতর কণ্ঠে অনুরোধ জানায় ,থিসিউস কে মিনোটর এর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। ডিডেলাস থিসিউস কে সাহায্য করে। সে থিসিউস কে একটা সুতোর গোলক দিলো। থিসিউস ল্যাবিরিন্থের প্রবেশ পথে গোলকের সুতোর এক প্রান্ত বেধে নিল , আর বাকি প্রান্ত ছিল তার কাছেই। ল্যাবিরিন্থে ঢুকে সে হত্যা করলো মিনোটরকে। এবং সুতো ধরে বের হয়ে আসলো ল্যাবিরিন্থ থেকে।


রাজা এই ঘটনা আবিস্কার করে অনেক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন ডিডেলাসের উপর। তিনি ডিডেলাস ও তার পুত্র ইকারাস কে বন্দী করলেন গোলক ধাঁধার মাঝে। কোন সাহায্য বা সুতোর গোলক ছাড়া ডিডেলাসের ও সম্ভব ছিল না নিজের তৈরি ল্যাবিরিন্থ থেকে বের হবার। তখন ডিডেলাস পালানোর নতুন পরিকল্পনা বের করলেন।
ডিডেলাস পাখির পালক জমানো শুরু করলেন। মৌচাক থেকে মোম সংগ্রহ করলেন। যখন পর্যাপ্ত পরিমানে পালক এবং মোম সংগৃহীত হল ,তখন তিনি দুই জোড়া পাখা তৈরি করা শুরু করলেন। এক জোড়া নিজে জন্য,এক জোড়া ইকারাসের জন্য।

পাখা তৈরি শেষ হলে তিনি ইকারাসকে পড়িয়ে দিলেন পাখা। তিনি নিজেও পড়লেন তার জোড়া। উড়তে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তিনি ইকারাসকে বারবার সাবধান করে দিলেন যাতে উড়তে উড়তে সে সূর্যের কাছে না চলে যায়। ডানা ঝাপটিয়ে তারা মুক্ত হলেন বন্দী দশা থেকে , ক্রীট কে পেছনে ফেলে চলে এলেন বহুদুরে।

কিন্তু হায় , এই উড্ডয়নের আনন্দে বিভোর ইকারাস তার বাবার সাবধান বানী ভুলে উড়তে উড়তে সূর্যের কাছেই চলে এলো। সূর্যের উত্তাপে পাখায় ব্যবহৃত মোম গলে গলে পড়তে থাকলো। তার পাখা খুলে গেলো এবং তার পতন হল সমুদ্রের গভীর জলরাশিতে। এভাবেই সলীল সমাধি হল পিতার অবাধ্য ইকারাস এর।

নিজের ছেলেকে চোখের সামনে মৃত্যুবরণ করতে দেখে পিতা তীব্র যন্ত্রণায় দগ্ধ হলেন। তবুও তার কিছু করার ছিল না। তিনি উড়তে উড়তে পৌঁছে গেলেন সিসিলি ,যেখানে সেইখানের রাজা তাকে সাদরে গ্রহুন করলেন।

এদিকে মাইনস ডিডেলাস কে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন । তিনি ডিডেলাসকে খুজে বের করার নতুন ফন্দি আঁটলেন। তিনি একটি জটিল এবং প্যাঁচানো সুক্ষ নল তৈরি করলেন । তিনি সর্বত্র ঘোষণা করে দিলেন ,যে ব্যক্তি এই নলের মধ্য থেকে সুতো নিতে পারবে একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত , তাকে তিনি অনেক বড় পুরস্কার দিবেন । ডিডেলাস এই ঘোষণা শুনে সিসিলির রাজাকে বললেন ,তিনি তা করতে পারবেন । ডিডেলাস নলের এক প্রান্তে একটা পিঁপড়া নিয়ে তার সাথে সুতো বেধে দিলেন। নলের অই প্রান্তটি বন্ধ করে দিলেন , ফলে পিঁপড়া একসময় নলের অপর প্রান্ত থেকে সুতো সহ বের হল।ডিডেলাস সমর্থ হলেন।

রাজা মাইনস বুঝলেন ,এটি ডিডেলাস ছাড়া আর কেউ করতে পারে না। তিনি তাই ডিডেলাসকে ধরার জন্য সিসিলিতে আসেন। কিন্তু সিসিলির রাজার সাথে মাইনসের যুদ্ধে মাইনস নিহত হন।

ডিডেলাস এর বাকি জীবনটা সিসিলিতেই কাটে। ডিডেলাস ও তার ছেলে ইকারাসের কাহিনীর সমাপ্তি এখানেই।

ছবি : ইন্টারনেট ।
তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট ।

# ইনকগনিটো : Blogger and online activist.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s