অশ্রুজলে লেখা ভাষা সংগ্রামের গান

জাগরণের গান ১৯৭১

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন জাগরণের গান ও সে সময়কার দুর্লভ ছবি নিয়ে এ আয়োজন—

২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট পেরিয়ে এসেছিল যে স্বাধীনতা দিবস!।। মাহমুদা সোনিয়া

গণহত্যা ও জনযুদ্ধের সূত্রপাতঃ
২৫ শে মার্চ ১৯৭১! এক নরকসম সুদীর্ঘ-দুঃসহ রাত। এ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী শুরু করে অপারেশন সার্চলাইট নামের নৃশংস গণহত্যাযজ্ঞ। এশিয়া টাইমসের, ভাষ্য অনুযায়ী ,

সামরিক বাহিনীর বড় বড় অফিসারদের নিয়ে বৈঠকে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করে “তিরিশ লক্ষ বাঙ্গালিকে হত্যা কর, তখন দেখবে তারা আমাদের হাত চেটে খাবে।” সে পরিকল্পনা মতোই ২৫শে মার্চের রাতে পাকিস্তানী আর্মি অপারেশন সার্চলাইট আরম্ভ করে যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙ্গালি প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়া। এরই অংশ হিসাবে সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালি সদস্যদের নিরস্ত্র করে হত্যা করা হয়, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ নিধন করা হয় এবং সারা বাংলাদেশে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা করা হয়।

তৎকালীন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকা থেকে অনুমান করা যায়, এই অপারেশনে প্রায় ১ লক্ষ্য হত্যা করা হয়।
“According to New York Times (3/28/71) 10,000 people were killed; New York Times (3/29/71) 5,000-7,000 people were killed in Dhaka; The Sydney Morning Herald (3/29/71) 10,000 – 100,000 were killed; New York Times (4/1/71) 35,000 were killed in Dhaka during Operation Searchlight.”

যদিও হত্যাকাণ্ডের খবর যাতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে না পৌঁছায় সে লক্ষ্যে ২৫ মার্চের আগেই বিদেশী সাংবাদিককে ঢাকা পরিত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারপরও সাংবাদিক সাইমন ড্রিং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় অবস্থান ক’রে ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সারা পৃথিবীকে এই গণহত্যার খবর জানিয়েছিলেন। যদিও এই হত্যাযজ্ঞের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা, বাঙালি হত্যা পুরো দেশজুড়ে চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের আবাসিক হলগুলো ছিল তাদের বিশেষ লক্ষ। একমাত্র হিন্দু আবাসিক হল – জগন্নাথ হল পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এতে ৬০০ থেকে ৭০০ আবাসিক ছাত্র নিহত হয়। যদিও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ধরনের ঠান্ডা মাথার হত্যাকান্ডের কথা অস্বীকার করেছে তবে হামিদুর রহমান কমিশনের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করেছিলো। জগন্নাথ হল এবং অন্যান্য ছাত্র হলগুলোতে পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞের চিত্র ভিডিওটেপে ধারণ করেন তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইন্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনলজি (বর্তমান বুয়েট) এর প্রফেসর নূরুল উলা। পুরো বাংলাদেশেই হিন্দু এলাকাগুলো বিশেষ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মধ্যরাতের আগেই, ঢাকা পুরোপুরি জ্বলছিল, বিশেষভাবে পূর্ব দিকের হিন্দু প্রধান এলাকাগুলো। ২রা আগস্ট, ১৯৭১ টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, “হিন্দু,যারা মোট রিফিউজিদের তিন-চতুর্থাংশ, পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর ক্রোধ ও আক্রোশ বহন করছিল”।

অপারেশন সার্চলাইট (Operation Searchlight)

পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত এক জেনোসাইডের নাম ‘অপারেশন সার্চলাইট! অত্যন্ত সুনিপনভাবে- ঠাণ্ডা মাথায় পাক সামরিক নেতারা এর পরিকল্পনা করেছিল। ২২ ফেব্রুয়ারি সামরিক নেতাদের সাথে এক বৈঠকে মেজর জেনারেল খাদিম হসাইন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী মূল পরিকল্পনা তুলে ধরে। বাঙালি নিধনের নীলনকশার পরিকল্পনা শেষ করেই, শেখ মুজিবের সাথে, ভুট্টো আর ইয়াইহা একটি লোকদেখানো বৈঠকও করে।

”The plan was drawn up in March 1971 by Maj.Gen. Khadim Hussain Raza and Maj.Gen. Rao Farman Ali, as a result of a meeting between Pakistani army staff on the 22nd of February. Senior Pakistani officers in East Pakistan who were unwilling to support any military attack on civilians, Lt.Gen. Shahabzada Yakub Khan, GOC East Pakistan, and the governor Vice Adm. Ahsan, were relieved of their duties. As a replacement of these two officials, Lt.Gen. Tikka Khan was made both the Governor and GOC of East Pakistan.

On March 17, Gen. Khadim Hussain Raza was given the go ahead to plan for the crackdown via telephone by Gen. Hamid, COS Pakistan Army. On the morning of March 18, Gen. Raza and Maj.Gen. Rao Farman Ali put the details to paper at the GOC’s office at Dhaka cantonment. The plan was written on a light blue office pad with a lead pencil by Gen. Farman containing sixteen paragraphs spread over five pages.”

Operation Searchlight : The Background of 25th March Genocide

১৯৭১সালে ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যা, যার মধ্যমে তারা ১৯৭১ এর মার্চ ও এর পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল।এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাষকদের আদেশে পরিচালিত,যা ১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত অপারেশন ব্লিটজ্‌ এর পরবর্তি অনুষঙ্গ।


দ্যা মাডারারস!!
অপারেশনটির আসল উদ্দেশ্য ছিল ২৬ মার্চএর মধ্যে সব বড় বড় শহর দখল করে নেয়া এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের এক মাসের ভেতর নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। বাঙালিরা তখন পাল্টা প্রতিরোধ সৃষ্টি করে,যা পাকিস্তানী পরিকল্পনাকারীদের ধারণার বাইরে ছিল। মে এর মাঝামাঝি সময়ে সকল বড় বড় শহরের পতন ঘটার মধ্যে দিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের প্রধান অংশ শেষ হয়। এই সামরিক আক্রমণ ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে তরান্বিত করে। এই গণহত্যা বাঙালিদের ক্রুদ্ধ করে তোলে যে কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয় এবং বহু মানুষকে শরণার্থী রূপে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়।

এই ভয়াবহ গণহত্যা ১৯৭১ এর ইন্দো-পাকিস্তান যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করার পিছনের একটি বড় কারণ,যার ফলে বাঙালি মুক্তিবাহিনী দখলদারী পাকিস্তানী বাহিনীকে বিতারিত করার যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং এর ফলাফল স্বরূপ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড “মিত্র বাহিনী” এর কাছে বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করে।

পরিকল্পনা পদ্ধতি

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ এ পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে মার্চের শুরুতে ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি অপারেশনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েতা হতে ১৬তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন এবং খরিয়ান থেকে ১৯তম ডিভিশনকে ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার আদেশ দেয়া হয়।

পাকিস্তানের উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি লে জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল এস এম আহসান পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের উপর সামরিক হামলার বিরোধী ছিলেন বলে অপারেশনের পূর্বেই তাদেরকে দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দেয়া হয়। লে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও জিওসি করে পাঠানো হয়। মার্চের ১৭ তারিখ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সিওএস জেনারেল হামিদ টেলিফোন করে জেনারেল রাজাকে অপারেশনের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৮ মার্চ সকালে ঢাকা সেনানিবাসের জিওসি কার্যালয়ে বসে জেনারেল রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি অপারেশনের পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনাটি জেনারেল ফরমান নিজ হাতে হালকা নীল রঙের একটি অফিস প্যাডের ৫ পাতা জুড়ে লিড পেন্সিল দিয়ে লিখে নেন।


দ্যা মাডার!

জেনারেল ফরমান অপারেশনের সিদ্ধান্ত, এবং সাফ্যলের শর্ত ইত্যাদির সীমা তৈরি করেন এবং জেনারেল খাদিম সেনাদলের স্থান বিতরন, বিভিন্ন ব্রিগেড ও ইউনিটের উপর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বন্টন ইত্যাদি কাজ তদারকি করেন। এটা ধারণা করা হয় যে বাঙালি সেনারা অপারেশনের শুরুর সময় বিদ্রোহ করবে, তাই পরিকল্পনাকারীরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে আলাপকালে বাঙালি সৈন্যদের অপারেশনের পূর্বেই নিরস্ত্র করার এবং বাঙালি রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতারের প্রস্তাব দেন। ‘অপারেশনের সব কিছুই নির্ধারিত হল।’ – হাতে লিখিত পরিকল্পনাটি ২০ মার্চে আবার জেনারেল হামিদ এবং লে জেনারেল টিক্কা পর্যালোচনা করেন। জেনারেল হামিদ তাৎক্ষনিকভাবে বাঙালি সেনা ইউনিটগুলোকে নিরস্ত্র করার সিদ্ধান্ত নিলেও শুধুমাত্র ই পি আর, আর্মড পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীদের নিরস্ত্র করার অনুমতি দেন। ইয়াহিয়া খান তার সাথে এক বৈঠকের সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতারের পরিকল্পনাকে প্রত্যখ্যান করেন। পুণঃনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয় এবং বিভিন্ন এলাকার কমান্ডারদের কাছে বিতরন করে দেয়া হয়।

অপারেশন শুরু হয় ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতের শেষ প্রহরে এবং অন্যান্য গ্যারিসনকে ফোন কলের মাধ্যমে তাদের জিরো আওয়ারে (অপারেশন শুরুর পূর্বনির্ধারিত সময়) তাদের কার্যক্রম শুরু করার জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়। ঢাকার সৈন্যদের কমান্ডে ছিলেন রাও ফরমান আলি এবং অন্যান্য সব স্থানের সৈন্যদের কমান্ডে ছিলেন জেনারেল খাদেম। জেনারেল টিক্কা এবং তার কর্মকর্তারা ৩১তম কমান্ড সেন্টারের সব কিছু তদারক করা এবং ১৪তম ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগীতা করার উদ্দেশ্যে উপস্থিত ছিলেন।

Siddiq Salik এর বিখ্যাত বই “Witness to Surrender” থেকে OPERATION SEARCHLIGHT এর নীলনকশা সম্পর্কে যা আমরা জানতে পারি তা নিন্মরুপ।

গৃহিত সিদ্ধান্তসমূহ

পাকিস্তানী পরিকল্পনাকারিদের গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন অংশ এবং স্বশস্ত্র বাহিনীর যারা সামরিক শাষনকালে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জুগিয়েছে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। অপারেশনের সর্বোচ্চ সার্থকতার জন্য ধুর্ততা, চমকে দেয়া, প্রবঞ্চনা, এবং দ্রুতগতি ইত্যাদি বিষয়ের উপর জোড় দেয়া হয়। নির্বাধ এবং সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। সাধারণ জনবসতি এবং হিন্দু এলাকাগুলোতে অনুসন্ধান এবং আক্রমণের কর্তৃত্বও প্রদান করা হয়।

সাফল্যের নিয়ামকগুলো

১) সারা পূর্বপাকিস্তানে একযোগে অপারেশন শুরু করতে হবে।
২) সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষকদের গ্রেফতার করতে হবে।
৩) ঢাকায় অপারেশন ১০০% সফল হওয়া বাধ্যতামূলক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল এবং তল্লাশী করতে হবে।
৪) সেনানিবাসকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে উন্মুক্ত ও সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অস্ত্র ব্যবহারের কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়।
৫) টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও টেলিগ্রাফ সহ সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে।
৬) সকল পূর্বপাকিস্তানী (বাঙালি) সৈন্যদলকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিয়ে নিস্ক্রিয় করে দিতে হবে।
৭) আওয়ামী লীগের মনে ভূল ধারণা সৃষ্টি করে তাদের ব্যস্ত রাখার জন্য ইয়াহিয়া খান আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অভিনয় করবেন। এমনকি ভুট্টো যদি আওয়ামী লীগের প্রস্থাবে রাজি হয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, তবুও ইয়াহিয়া আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

পরিকল্পনায় পূর্ব নির্ধারিত আক্রমণাত্মক অপারেশন পরিচালনার জন্য চিহ্নিত স্থানগুলো ছিল- ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর এবং সিলেট। এসব স্থানে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের সমাবেশ বেশি ছিল। পূর্বপাকিস্তানের অন্যান্য স্থানে অবস্থিত সৈন্যদল এবং প্যরা মিলিটারি বাহিনীরা তাদের নিজ নিজ এলাকা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে রয়ে যাবে এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য স্থানে প্রাথমিক অপারেশনের সময় শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যোগ দেবে। ঢাকা সম্পুর্ন নিরাপদ হলে পাকিস্তানের ৯ম এবং ১৬তম ডিভিশনের সৈন্যরা শক্তিবৃদ্ধির জন্য বিমান যোগে ঢাকা চলে আসবে। যেসব শহরে বিমানঘাঁটি আছে(চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রংপুর, কুমিল্লা) সেসব শহরে সরাসরি ঢাকা থেকে সি-১৩০ (C-130) বিমান অথবা হেলিকপ্টার ট্রুপস এর মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধি করা হবে।

”The planned and designated centers of offensive operations under that plan were Dhaka, Khulna, Chittagong, Comilla, Jessore, Rajshahi, Rangpur, Saidpur and Sylhet areas, where West Pakistani army units were concentrated.
Although the plan did not specify the time needed to subdue East Pakistan, it was assumed that after the arrest of the political leadership and disarming of the Bengali military and paramilitary units, civilians could be terrorized into submitting to martial law within a week. Lt. Gen. Tikka Khan estimated that no resistance would remain after April 10.”

সূত্রঃ Operation Searchlight (The Dark Night of Bangladesh) – March 25

যদিও পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানকে দমন করার জন্য কোন নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয়া হয় নি, এটা ধারণা করা হয় যে রাজণৈতিক নেতাদের গ্রেফতার এবং বাঙালি সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীদের নিরস্ত্র করার পর সাধারণ জনগণদের ভয় দেখিয়ে এক সাপ্তাহের মধ্যে সামরিক শাষনের আওতাভূক্ত করা হবে। লে জেনারেল টিক্কা বলেন যে ১০ এপ্রিলের পর আর কোন বাধা বিপত্তি থাকবে না।

জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাত লেখক-গবেষক R. J. Rummel তাঁর বইতেও উল্লেখ করেন, বাঙালি নিধনের পাক বাহিনীর এই অপারেশন সার্চলাইট ছিল- পূর্বপরিকল্পিত নৃশংস গণহত্যা।
In East Pakistan (now Bangladesh) [General Agha Mohammed Yahya Khan and his top generals] also planned to murder its Bengali intellectual, cultural, and political elite. They also planned to indiscriminately murder hundreds of thousands of its Hindus and drive the rest into India. They also planned to destroy its economic base to insure that it would be subordinate to West Pakistan for at least a generation to come. This despicable and cutthroat plan was outright genocide.

পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সেনাদের বিন্যাস

১৪তম পদাতিক ডিভিশনই পাকিস্তানী সেনাদের একমাত্র ডিভিশন যাদের পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ এর মার্চে ঘাঁটি ছিল। যেখানে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ি তিনটে ব্রিগেড থাকার কথা, সেখানে এই ডিভিশনে চারটি পদাতিক ব্রিগেড ছিল। ৫৭তম পদাতিক বাহিনীকে(পশ্চিম পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার জাহানবাজ আরবাব এর অধীনে) ঢাকায়, ৫৩তম পদাতিক বাহিনীকে(পশ্চিম পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফির অধীনে) কুমিল্লায়, ২৩তম ব্রিগেডকে(পশ্চিম পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহ খান মালিকের অধীনে) রংপুরে এবং ১০৭তম ব্রিগেডকে(পশ্চিম পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার এআর দুররানির অধীনে) যশোরে পাঠানো হয়। ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার নামের একজন বাঙালি ব্রিগেডিয়ার ছিলেন চট্টগ্রামের কমান্ডে। সাধারণ ভাবে প্রতি ব্রিগেডে ৩ থেকে ৪টি পদাতিক ব্যটেলিয়ন ও একটি ফিল্ড আর্টিলারী রেজিমেন্ট এবং আরো কিছু সাহায্যকারী অংশ থাকে।

এই চারটি ব্রিগেডে মোট ১২টি পদাতিক ব্যটেলিয়ন ছিল(প্রতি রেজিমেন্টে সাধারণত ৯১৫ জন সৈন্য থাকে) যেগুলোর সব গুলোতে ছিল শুধুমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা(প্রধানত পাঞ্জাব, বালুচ, পাঠান এবং সিন্ধিদেরই প্রাধান্য দেয়া হয়)। তাদের ২৫ মার্চের আগেই পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসা হয়। এই ডিভিশনের আরো ছিল ৫টি ফিল্ড আর্টিলারী রেজিমেন্ট, একটি হালকা এন্টি এয়ারক্রাফট রেজিমেন্ট, একটি কমান্ডো ব্যটেলিয়ন(৩য়), যেগুলোর সবগুলোতেই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের প্রাধান্য। রংপুরে অবস্থানরত ২৯তম অশ্বারোহী রেজিমেন্টই ছিল পুর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত একমাত্র স্বশস্ত্র মিশ্র(যেখানে বাঙালি সৈন্য ছিল) রেজিমেন্ট। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এর প্রায় ২০% সৈন্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের, যেখানে বিভিন্ন ইউনিট এবং সেনানিবাসের সাহায্যকারী সৈন্যরা ছিল মিশ্র জাতীয়্তার। বেশিরভাগ ইউনিটের ইউনিট কমান্ডার এবং উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাগণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী।

ঢাকা বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তানী বিমান বাহিনীর ২০টি এফ-৮৬ সাবের জেট এবং ৩টি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান ছিল। সশস্ত্র বাহিনীর এক স্কোয়াড্রন ৪টি এমআই-৮ এবং ৪টি এলট-III হেলিকপ্টার পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়। সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অপারেশনের জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুরের কাছাকাছি লালমনিরহাটে, সিলেটের কাছাকাছি সালুটি করে, যশোরে এবং ঠাকুরগাঁয়ের কাছে বিমানঘাঁটিগুলো স্থাপন করা হয়।

পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান নৌবাহিনীর চারটি গানবোট (রাজশাহী, যশোর , কুমিল্লা এবং সিলেটে) একটি পেট্রোল বোট (বালাঘাট) এবং একটি পিএনএস জাহাঙ্গির নামে একটি ডেস্ট্রয়ার ছিল। পাকিস্তানী নৌবাহিনীর পিএনএস বাবুর নামের পতাকাবাহী জাহাজ অপারেশন শুরুর পর পূর্ব পাকিস্তানে আসবে। বেশির ভাগ নৌঘাঁটিই ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও মংলায়।

বিভিন্ন পদক্ষেপ

অপারেশনে নামার আগেই যাতে সংশ্লিষ্ট সব পাকিস্তানী ইউনিট কমান্ডার তাদের দায়িত্ব বুঝে নিতে পারে সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল অপারেশনর সার্চলাইটের পরিকল্পনাকারীদের। আর এই কাজটি করা দরকার ছিল সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের একত্রিত করা, অস্ত্রশস্ত্রের যোগান, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সৈনিক পূর্ব পাকিস্তানে আনা, আঞ্চলিক সেনানায়কদের কার্যবিবরণী প্রদান- এই সব কিছুই করা প্রয়োজন ছিল কোন সন্দেহের উদ্রেক না ঘটিয়ে। ২৪ ও ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী জেনারেলদের একটি দল হেলিকপ্টারে করে প্রধান প্রধান গ্যারিসনগুলো পরিদর্শন করেন এবং গ্যারিসন কমান্ডার ও অপারেশনের অন্যান্য সিনিয়র পাকিস্তানী কর্মকর্তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। এই দলের সাথে ছিলেন জেনারেল হামিদ, জেনারেল Mittha, কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল এবং প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার কর্নেল সাদউল্লাহ। জেনারেল ফরমানকে যশোরে পাঠানো হয়, জেনারেল খাদিম নিজে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের গ্যারিসন কমান্ডারদের ব্রিফ করেন এবং ব্রিগেডিয়ার El-Edrus ও কর্নেল সাদউল্লাহ রংপুর সফরে যান।

সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় ছিল। না জানলেই নয় এমন কিছু ক্ষেত্রে কেবল গুটিকয়েক লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে বিস্তারিত জানানো হয়েছিল। কিছু বাঙালি কর্মকর্তা পাকিস্তানীদের ঘনঘন ব্রিফিং দেখে সন্দেহ করেছিলেন কিছু একটার, কিন্তু ব্রিফিং এ কি ঘটেছে সে সম্পর্কে আক্রমণের পূর্বে তাদের কোন ধারণাই ছিল না।

রসদপত্র ব্যবস্থাপনা

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে মেজর জেনারেল কামার আলি মির্জা এবং ব্রিগেডিয়ার হ্যারিসন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব আসেন রসদপত্র ব্যবস্থাপনার জন্য, মূল কারণ ছিল তখন অসহযোগিতার কার্যকলাপের কারণে সেনানিবাসগুলোতে খাদ্য সরবরাহ বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছিল। অস্ত্রের মূল ভাণ্ডার ছিল ঢাকার অদূরে অবস্থিত রাজেন্দ্রপুরে এবং ৯০০০ টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ চট্টগ্রামে এমভি সোয়াত নামের একটি জাহাজে খালাসের অপেক্ষায় ছিল।

সুতরাং জাহাজ থেকে রসদপত্র খুব দ্রুত খালাসের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ততোদিনে ১৩ এফএফ এবং ২২ বালুচ ঢাকায় পৌঁছে গেছে, পাকিস্তান থেকে পিআইএ ফ্লাইট এ করে বিশেষ যাত্রীরা ঢাকায় আসতে শুরু করেছে। ২৯ পাকিস্তানীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সফলতা নিশ্চিত করতে ২৫ মার্চের আগেই পশ্চিম থেকে পুরো একটি ব্রিগেড পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো। ধীরে ধীরে সৈন্য ও রসদপত্র পাঠানোটা সেই মহাপরিকল্পনারই অংশ ছিল। পূর্বে আসা নতুন সৈনিকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অনেক নতুন নতুন ব্যবস্থা করতে হয়েছিল, সাপ্লাই ইউনিট এর বাঙালি সদস্যরা এটা বুঝতে পেরেছিল আগেই।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অদল বদল

সফলতা নিশ্চিত করার জন্য সামরিক বাহিনী বাঙালি কর্মকর্তাদের স্পর্শকাতর স্থানগুলো থেকে বদলী করে দিয়ে সেখানে পাকিস্তানী বাহিনী মোতায়েন করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত দুটি পাকিস্তানী ইউনিট, ২৫তম পাঞ্জাব ও ২০তম বেলুচ, এর প্রত্যাবর্তন পিছিয়ে দেয়া হয়, তার ওপর ২৫ মার্চের আআগেই পশ্চিম থেকে ঢাকায় উড়ে আসে ১৩তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স ও ২২তম বেলুচ রেজিমেন্ট। গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য ২৫ মার্চের আগে পূর্ব পাকিস্তানের অন্য কোন গ্যারিসনে প্রথমেই অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানো হয় নি।

ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গুলি বর্ষণে অস্বীকৃতি জানিয়ে এমভি সোয়াত এর মালামাল খালাসের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করলে তাকে ২৪ মার্চ তার পদ থেকে অব্যাহতি দেন জেনারেল খাদিম। তাকে এই বলে অব্যাহতি দেয়া হয়ে যে তার এখন জয়দেবপুরে গিয়ে ২ ইবিআর এর কাছে রিপোর্ট করতে হবে, তার বদলে ব্রিগেডিয়ার এম এইচ আনসারি চট্টগ্রাম এলাকার দায়িত্ব পান। মার্চের ২২ তারিখ ঢাকায় অবস্থানরত ৫৭তম ব্রিগেড এর ব্রিগেড মেজর মেজর খালেদ মোশাররফ কে বদলি করে কুমিল্লায় ৪র্থ ইবিআর এর ২আইসি হিসেবে পাঠানো হয়। ২৩ মার্চ ২য় ইবিআর এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মাসুদুল হাসানকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং ২৫ মার্চ তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন লে. কর্নেল রকিবউদ্দিন।

অবশ্য পাকিস্তানীরা গণহারে বাঙালি কর্মকর্তাদের বদলি করা থেকে বিরত থেকেছিল, কারণ সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বিনষ্ট হতে পারতো। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সব ছুটির দরখাস্ত বাতিল করে দেয়ার পরও মার্চে পাকিস্তানী কর্তপক্ষ আবার বাঙালি অফিসারদেরকে ছুটি নিতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদিকে পাকিস্তানী কর্মকর্তাদেরকে কোন ছুটি না নিয়ে সদা সতর্ক থাকতে বলা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মকর্তা ও সৈন্যদের পরিবারের সদস্যদেরকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেয়া হয় এবং তার বদলে সুযোগ সুবিধা মত কিছু পশ্চিম পাকিস্তানী বেসামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের পূর্ব পাকিস্তানে এনে রাখা হয়।

২৫ মার্চের পূর্বে বাঙালি ইউনিটগুলোর বিস্তার

অপারেশন শুরুর আগেই সমস্ত নিয়মিত বাঙালি ইউনিটকে একসাথে নিরস্ত্র করার অনুমতি দেননি জেনারেল হামিদ, ফলে পাকিস্তানী নেতৃত্ব অন্যান্য উপায় বাঙালি ইউনিটগুলোর সম্ভাব্য হুমকি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে।

২৫ মার্চে এবং এর আগের সময়গুলোতে বাঙালি ইউনিটগুলোকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে ফেলা হয়, তাদেরকে সেনানিবাসের বাইরে পাঠানো হয় বিভিন্ন কাজ দেখিয়ে, এক অংশ থেকে আরেক অংশকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়, এবং সবগুলো অংশকেই রেডিও এবং তারহীন যোগাযোগের গ্রিড থেকে যত সম্ভব দূরে রাখা হয়। বাঙালি কর্মকর্তাদের হয় ছুটিতে পাঠিয়ে দেয়া হয় নয়তো নেতৃত্বের কেন্দ্র বা সরাসরি অপারেশনে নিয়োজিত ইউনিটগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মকর্তারা বাঙালি ইউনিট পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। বাঙালি সৈনিকদের অনেককে ছুটিতে পাঠানো হয়, অনেককে নিরস্ত্র করা হয়, তবে এমনভাবে কাজগুলো করা যাতে কারও মধ্যে কোন সন্দেহের উদ্রেক না হয়।

সাধারণ সময়ের তুলনায় তখন প্রথম ইবিআর এর শক্তি ছিল অর্ধেক, এই ইবিআর কেই শীতকালীন প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্তবর্তী চৌগাছায় পাঠানো হয়, ২৯ মার্চ পর্যন্ত তারা এখানেই ছিল। দ্বিতীয় ইবিআর এর কোম্পানিগুলোকে ঢাকার আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকেজো রাখা হয়। ৩য় ইবিআর এর কোম্পানিগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া হয় সৈয়দপুর সেনানিবাসের বাইরে গোড়াঘাট ও পার্বতীপুর এলাকার আশেপাশে। ৪র্থ ইবিআর ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শমসেরনগর এর মাঝামাঝি এলাকায়। একমাত্র চট্টগ্রামেই নিয়মিত বাঙালি ইউনিটগুলোকে তাদের স্বাভাবিক এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়নি।

পশ্চিম পাকিস্তানের ইপিআর বাহিনীর কোম্পানিগুলোকে শহরগুলোর যেখানেই পারা গেছে সেখানেই মোতায়েন করা হয়েছে। অপরদিকে বাঙালি ইপিআর বাহিনীকে পাঠানো হয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকায়। অধিকাংশ ইপিআর ইউনিট তাদের মূল অ্যাকশন এর অঞ্চল থেকে অনেক দূরে ছিল এবং নিজ অবস্থান থেকে বড় শহরগুলোতে পৌঁছতে তাদের অন্তত ১ দিন লাগতো। ২৪ অথবা ২৫ মার্চ রাতে ইপিআর এর বেতার যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়।

অপারেশন সার্চলাইটঃ ২৫/২৬ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল

এটি হচ্ছে ২৫ মার্চ হতে ১০ এপ্রিল সময়ে অর্থাৎ অপারেশন যে সময়ের শেষ হয় সে সময়ে পাকিস্তানী সশস্ত্র বাহিনী কোন কোন স্থানে নিয়োজিত ছিল এবং সামরিক আক্রমণের ফলাফলের পূর্ন বিবরন। যেসব স্থানকে অপারেশন সার্চলাইটে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এখানে শুধু সেগুলোর বিবরন আছে, সারা পুর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের প্রতিরোধের কথা নেই। কোন কোন স্থানে ২৫ মার্চেই পাকিস্তানী আক্রমণ ও গণহত্যা শুরু হবার সাথে সাথেই বাঙালি বাহিনীর সাথে সাথে পাকিস্তানীদের সংঘর্ষ বেধে যায়।

ঢাকা

মেজর জেনারেল ফরমানের নেতৃত্বে ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর নিম্ন লিখিত লক্ষ্য ছিলঃ

** রাত ১১টায় কারফিউ জারি করা এবং টেলিফোন/টেলিগ্রাফ/রেডিও স্টেশন এবং সকল প্রকার পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া।
** ঢাকা শহরের সড়ক, রেল ও নৌ-পথের দখল নিয়ে সারা শহর বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং নদীতে টহল জারি করা।
** অপারেশন চলাকালীণ সময়ের মধ্যে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের আরো ১৫ জন বড় নেতাদের গ্রেফতার করা।
ধানমন্ডি এলাকায় এবং হিন্দু এলাকাগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্চ (খোঁজ) করা।
** ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদর দফতর, এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন ধ্বংস ও পরাভূত করা এবং ২য় ও ১০ম ইবিআর কে নিরস্ত্র করা।
** গাজিপুর অস্ত্র কারখানা এবং রাজেন্দ্রপুরের অস্ত্রগুদাম দখল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ঘটনার পরম্পরা : মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি কর্তৃক প্রণীত ঢাকা আক্রমণের পাকিস্তানী পরিকল্পনা ছিল নিম্নরূপঃ

১। ১৩তম সীমান্তবর্তি সৈন্যদল সেনানিবাসে সংরক্ষিত শক্তি হিসাবে থাকবে এবং নিরাপত্তা প্রদান করবে।
২। ৪৩তম হালকা বিমানবিধ্বংসী বাহিনী তেজগাঁও বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।
৩। ২২তম বালুচ রেজিমেন্ট ইপিআর বাহিনীকে নিরস্ত্র করবে এবং ইপিআর সদর দফতরের ওয়্যারলেস ব্যবস্থা দখলে নেবে।
৪। ৩২তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট রাজারবাগ পুলিশ লাইনকে নিস্ক্রিয় করবে।
৫। ১৮তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের দায়িত্ব ছিল পুরান ঢাকা এবং নবাবপুরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৬। ৩১তম ফিল্ড রেজিমেন্ট মোহাম্মদপুর এবং মিরপুরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল।
৭। 3 SSG এর একটি প্লাটুন মুজিবকে ধরার দায়িত্বে ছিল।
৮। ২২তম বালুচ এবং ৩২তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্রোহীদের নিস্ক্রিয় করার দায়িত্বে ছিল।
৯। ২২তম বালুচ রেজিমেন্ট এরপর পিলখানার শক্তি বৃদ্ধি করবে।

যখন ২২তম বালুচ রেজিমেন্ট ২৫ মার্চ সকালের সময়ে পিলখানার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে নিল তখন বাঙালি ইপিআর অফিসারদের পাকিস্তানী অফিসাররা পিলখানায় ব্যস্ত রেখেছিল এবং সৈন্যদের প্রায় সবাইকে কাজ বন্ধ রেখে বিশ্রামে পাঠানো হয়। সন্ধ্যার পরপরই সারা শহরে গুজব ছড়িয়ে পরে যে ইয়াহিয়া খান চলে গেছে এবং তখন আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় রাস্তায় হালকা প্রতিবন্ধক বসানো শুরু করে, কিন্তু এই সব প্রতিবন্ধক পাকিস্তানী সৈন্যদের চলাচলে কোন তাৎপর্যপূর্ন বাধার সৃষ্টি করতে পারে নি। যেসব স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় প্রতিবন্ধক স্থাপন করছিল তারাই পাকিস্তানী সৈন্যদের দ্বারা প্রথম আক্রান্ত হয়। যদিও অপারেশন রাত ১১টায় শুরু হবার কথা, পাকিস্তানী সৈন্যরা ১১.৩০এ ঢাকা সেনানিবাস থেকে বের হয় কারণ পাকিস্তানী ফিল্ড কমান্ডার চাইছিলেন যে বাঙালি সৈন্যরা যাতে প্রতিক্রিয়া করার কোন সুযোগ না পায়। সেনা বাহিনীকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য ৬ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী আক্রমণ শুরু করার আগেই দ্রুততার সাথে ঢাকা শহরের সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

১০ম বাঙালি রেজিমেন্টকে সেনানিবাসে সহজেই নিরস্ত্র এবং পরে নিশ্চিহ্ন করা হয়। ৩১তম ফিল্ড রেজিমেন্টকে ঢাকার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ন এলাকা এবং শহরের উত্তরাংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর বেলাল এবং লে.কর্নেল জেড এ খানের সাথে নিযুক্ত কমান্ডো বাহিনী অপারেশনের শুরুতেই সহজেই শেখ মুজিবুর রহমানকে ধরতে সক্ষম হয়, কিন্তু আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা কৌশলে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন এবং ২৯ মার্চের ভেতর শহর ত্যাগ করেন।
২২তম বালুচ রেজিমেন্ট ইপিআর সদর দফতরে অবস্থিত বেশিরভাগ নিরস্ত্র এবং অসংগঠিত ইপিআর সৈন্যদের আক্রমণ করে সারা রাত যুদ্ধ করার পর পরাজিত ও পরাভূত করতে সক্ষম হয।

ময়মনসিংহ-জয়দেবপুর
২য় ইবিআর দলকে ঢাকার দক্ষিণে জয়দেবপুরের পাঠানো হয়, এবং গাজিপুরের অস্ত্র কারখানা (যেখানে ছোট একটি অস্ত্র গুদাম ছিল) এবং রাজেন্দ্রপুর গোলাবারুদ কারখানা (এখানেও একটি গোলাবারুদের গুদাম ছিল) থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। পাকিস্তানী পরিকল্পনাকারীদের ভয় ছিল যে এই বাঙালি ইউনিট ঢাকা বিমানবন্দর অথবা সেনানিবাস আক্রমণ করতে পারে এবং ২৫/২৬ মার্চের অপারেশন ভন্ডুল করে দিতে পারে। যদিও লে.কর্নেল মাসুদুল হাসান মেজর কে.এম শফিউল্লাহ কে পাকিস্তানী আক্রমণ সম্পর্কে ২৬ মার্চেই টেলিফোনে বলে দিয়েছিলেন, তা সত্বেও উক্ত ইউনিট ২৭ মার্চের পূর্বে আক্রমনে যায়নি। পাকিস্তানী সৈন্যরা ২৬ মার্চেই রাজেন্দ্রপুর কারখানার দখল নিয়ে নেয় এবং গুদাম হতে তাদের গোলাবারুদের সরবরাহ পূর্ন করে।

পাকিস্তানী ইউনিট ইপিআর কোম্পানীকে ২৭ মার্চে আক্রমণ করে কিন্তু পরাস্ত করে ২৮ মার্চে, যে সময়ে ২য় উইঙের অন্যান্য কোম্পানীরা তাদের সাথে অবস্থিত পাকিস্তানী সৈন্যদের নিস্ক্রিয় করতে থাকে (হয় গ্রেফতার করে সীমান্তে পাঠিয়ে দিয়ে, নাহলে হত্যা করে) এবং মার্চের ২৯ তারিখের মধ্যে ময়মনসিংহ শহরে এবং এর উত্তর ও দক্ষিণে ছড়িয়ে যেতে থাকে। কে এম শফিউল্লাহ এর অধীনে ২য় ইবিআর বাহিনী ২৭মার্চ বিদ্রোহ করে, আংশিকভাবে গাজিপুর অস্ত্রাগার লুট করতে সক্ষম হয় এবং ৩০ মার্চ ময়মনসিংহে পুনরায় মিলিত হয়। শফিউল্লাহ ২য় ইবিআর এবং ৭টি ইপিআর কোম্পানীর দায়িত্ব নেন এবং মার্চের ৩০ তারিখের মধ্যে তার সৈন্যদের টাঙ্গাইল, বাহাদুরবাদ, সিরাজগঞ্জ এবং গফরগাঁয়ে ছড়িয়ে দেন। যে সময় ২য় ইবিআর কিশোরগঞ্জ এবং নরসিংদী হয়ে ঢাকা আক্রমণের উদ্দেশ্য যাচ্ছিল, তখন ৩টি ইপিআর কোম্পানীকে গোপনে আক্রমণ চালাতে ঢাকা পাঠানো হয়।

চট্টগ্রামঃ

চট্টগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র তেল শোধনাগার ছিল। যেখানে ছিল একটি বিশাল তেলের গুদাম এবং সব চেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর। এই স্মুদ্রবন্দরে ৯০০০টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে এম ভি সোয়াত অবস্থান করছিল। পশ্চিম পাকিস্তানী চট্টগ্রাম গ্যরিসনে বাঙ্গালী সৈন্যরা প্রচুর পরিমাণে ছিল, যা পাকিস্তানী পরিকল্পনাকারীদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ই্পি আর এবং ইপি আর এর বাঙালি অফিসাররা পাকিস্তানী বাহিনীর উপর আগে থেকেই একটি আত্মরক্ষামূলক আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন, কিন্তু সিনিয়র বাঙালি অফিসাররা এই বিশ্বাস থেকে ক্যাপ্টেন রফিককে বিদ্রোহ করা থেকে নিরুৎসাহীত করেন যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বেসামরিক জনগনের বিরুদ্ধে কোন আক্রমণ চালাবে না, কিন্তু তারা এটা নিশ্চিত করেন যে পাকিস্তানী যে কোন আক্রমণের ঘটনায় তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করবেন। এম ভি সোয়াত থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সেনানিবাসে নিয়ে যাবার প্র্চেষ্টা ২০-২৫ মার্চের মধ্যে সাধারণ প্রতিবাদকারীদের বাধার কারণে সাময়িক ভাবে ব্যর্থ হয় এবং সে সকল প্রতিবাদকারীদের অনেকেই সেনাসদস্যদের দ্বারা আক্রান্ত ও গুলিবিদ্ধ হয়।

পাকিস্তানী বাহিনীকে চট্টগ্রামে নিম্নলিখিত লক্ষ্যসমূহ ঠিক করে দেয়া হয়:
১) ই বি আর সি ইউনিট, ৮ম ই বি আর, ই পি আর এবং পুলিশ বাহিনীকে নিরস্ত্র করা।
২) পুলিশের অস্ত্রসস্ত্র, রেডিও স্টেশন এবং টেলিফোন এক্সচেইঞ্জ দখল করে নেয়া।
৩) পাকিস্তানী নৌবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করা।
৪) লে কর্নেল এম আর চৌধুরী এবং আওয়ামি লীগ নেতৃবৃন্দদের গ্রেফতার করা।

সিলেট- যশোরঃ
এ অঞ্চলে অপারেশন সার্চলাইটে পাক বাহিনীর লক্ষ্য সমূহ ছিলঃ
১) সিলেট রেডিও ষ্টেশন, কিং ব্রিজ ও এয়ারপোর্ট দখল।
২) ইপিআর এবং পুলিশ আক্রমন ও আওয়ামী নেতাদের এরেস্ট করা।
৩) যশোর থেকে খুলনা ক্যান্টনমেন্টকে পরিচালিত ও দখল করা।

খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া সহ প্রধান প্রধান শহর গুলোতেও সেই একই কায়দায় প্ল্যান করা হয়।

অপারেশন সার্চলাইট পেরিয়ে যে স্বাধীনতার ঘোষণাঃ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। কথিত আছে, গ্রেপ্তার হবার একটু আগে ২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর (অর্থাৎ, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে) তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা চট্টগ্রামে অবস্থিত তত্কালীন ই.পি.আর এর ট্রান্সমিটারে করে প্রচার করার জন্য পাঠানো হয় ঘোষণাটি নিম্নরুপ:

অনুবাদ:
এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উত্খাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।

২৬শে মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েক’জন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ.হান্নান প্রথম শেখ মুজিব এর স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি মাইকিং করে প্রচার করেন। পরে ২৭ শে মার্চ আনুমানিক ৭.০০- ৭.৩০ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর হয়ে তিনি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেন সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান। ঘোষণাপত্রটির ভাষ্য নিম্নরুপ:

অনুবাদ:
আমি,মেজর জিয়া, বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির প্রাদেশিক কমাণ্ডার-ইন-চিফ, শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি আরো ঘোষণা করছি যে, আমরা শেখ মুজিবর রহমানের অধীনে একটি সার্বভৌম ও আইনসিদ্ধ সরকার গঠন করেছি যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সরকার জোট-নিরপেক্ষ নীতি মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। এ রাষ্ট্র সকল জাতীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং বিশ্বশান্তির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। আমি সকল দেশের সরকারকে তাদের নিজ নিজ দেশে বাংলাদেশের নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। শেখ মুজিবর রহমানের সরকার একটি সার্বভৌম ও আইনসম্মত সরকার এৰং বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবার দাবিদার।

১৯৭১ সালে ২৭ মার্চের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে যা নয় মাস স্থায়ী হয়। আমরা পাই, একটি স্বাধীন দেশ! টাইমসে ভাষায়, “The Bloody Birth of Bangladesh.”
স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে, অপারশন সার্চলাইটের নামে ইতিসাহের যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যা চালায় তা নজিরবিহীন। মার্চের শেষের সেই রাতগুলোতে আমরা যেসব নিরস্র, নিরপরাধী মানুষগুলোকে হারিয়েছি তাদের স্মরণ করবে এই জাতি চিরকাল- বিনম্র শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতায় আর ভালবাসায়।

তথ্যসমূহঃ
১) উইকি
২) 1971 fact
৩) Genocide- Bangladesh, 1971

বইঃ
১) মেজর(অবঃ) রফিকুল ইসলাম পি এস সি (১৯৯৫). মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস. কাকলী পাবলিশার্স।
২) মেজর জেনাঃ এন এস এ ভূইয়া (২০০০). মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস. আহমেদ পাবলিসিং হাউস।
৩) Siddiq Saliq (১৯৯৭). Witness to surrender.
৪) Maj. Gen Rao Farman Ali Khan, (1992). How Pakistan Got Divided. Jung Publishers.
৫) Major Rafiqul Islam, (2006). A Tale of Millions. Ananna.

রোহিঙ্গারা ‘র‌্যাডিকালাইজড’ হচ্ছে: বাংলাদেশকে দোভাল

অজিত দোভালমিয়ানমারে নির্যাতিত হয়ে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর যেসব লোকজন বাংলাদেশে বা পরে ভারতে ঢুকছে, ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়দার মতো সংগঠন তাদের র‌্যাডিকালাইজ করে জঙ্গি কাজকর্মে হাতেখড়ি দেওয়াতে চাইছে বলে বাংলাদেশকে সতর্ক করে দিয়েছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত দোভাল।

মার্কিন তরুণদের মত ট্রাম্প ‘অবৈধ’ প্রেসিডেন্ট

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে ‘অবৈধ’ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ তরুণ। ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণদের ওপর সম্প্রতি এক জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এতে দেখা গেছে, ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকার করতে চান না- এমন তরুণদের তিন-চতুর্থাংশই কৃষ্ণাঙ্গ, ল্যাটিনো ও এশিয়ান। খবর গার্ডিয়ানের।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাক ইয়ুথ প্রজেক্টের অংশ হিসেবে বার্তা সংস্থা এপি ও গবেষণা সংস্থা এনওআরসির যৌথ উদ্যোগে জেন-ফরওয়ার্ড এ জরিপটি পরিচালনা করে।

এতে দেখা যায়, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ মিলিয়ে গড়পরতায় ৫৭ শতাংশ তরুণ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবৈধ প্রেসিডেন্ট মনে করেন। শ্বেতাঙ্গদের ৫৩ শতাংশ ট্রাম্পকে বৈধ মনে করলেও তার কাজকে সমর্থন করেন না ওই জনগোষ্ঠীর ৫৫ শতাংশ।

সব ধরনের জনগোষ্ঠীর মধ্যে গড়ে মাত্র ২২ শতাংশ তরুণ মনে করেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি বৈধ। জরিপে অংশগ্রহণকারীর ৬২ শতাংশ ট্রাম্পের নীতি পছন্দ করেন না ।

মিসৌরির কানসাস শহরের শিক্ষার্থী রেবেকা গ্যালার্ডো (৩০) নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমেরিকা হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই চেয়েছেন।

যে সব কারাগারে ঢুকলে আর বেরোতেই ইচ্ছা হয় না!

নরওয়ের ব্যাস্টয় কারাগারে সূর্যস্নানের ব্যবস্থাকারাগার বা বন্দিশালা, যাই বা হোক না কেন, এটি এমন এক জায়গা- যেখানে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে না। আর যদি যেতেও হয়, তাহলে দ্বিতীয় দিন থেকেই শুরু হয় বেরিয়ে আসার পথ খোাঁজা। স্যাঁতসেঁতে ঘর, আলো-বাতাসের যেন প্রবেশ নিষেধ। সঙ্গে নিম্নমানের খাবার। কারাগার বলতে চোখের যাযাদি ডেস্ক সামনে ভেসে ওঠে এই পরিচিত দৃশ্যই।
কিন্তু কারাগারের চেনা এই সংজ্ঞাই যদি বদলে যায় কখনো? সামনের খোলা মাঠে আরাম করে ‘সান বাথ’ (সূর্যস্নান) নেয়ার ব্যবস্থা, প্রতিটি কারাকক্ষ তুলতুলে নরম বিছানার পাশাপাশি টেলিভিশন, ফ্রিজে সাজানো। আগে থেকে জানিয়ে দেয়া না হলে যে কেউ এগুলোকে ব্যক্তিগত বাড়ি বা বিলাসবহুল কোনো হোটেল ভেবে ভুল করতেই পারেন। তবে প্রকৃতপক্ষে এগুলো কারাগারই। পৃথিবীজুড়ে এমন বেশ কয়েকটিই আরামদায়ক আর বিলাসবহুল কারাগার রয়েছে।

অস্ট্রিয়ার ‘জাস্টিন সেন্ট্রাল লিওবেন’ কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এতটাই আকর্ষণীয় যে, প্রথম দেখায় এটিকে বিলাসবহুল হোটেল মনে হতে পারে। সেখানে প্রত্যেক কারাবন্দির জন্য আলাদা ঘর। আছে ব্যক্তিগত বাথরুম, রান্নাঘর, এমনকি বিনোদনের ব্যবস্থাও। বিভিন্ন ধরনের খেলার সরঞ্জামও রয়েছে এখানে।
পশ্চিমা বিশ্বে বিবাহ-বিচ্ছেদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে মা-বাবার যে কোনো একজনকে জেলে থাকতে হলে শিশুকে বড় হতে হয় একক অভিভাবকের (সিঙ্গল প্যারেন্ট) কাছে। এই সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েই তৈরি হয়েছে ‘প্রিজন ফর ফ্যামিলিজ’ নামে পরিচিতি পাওয়া স্পেনের ‘আরানজুয়েজ’ কারাগারটি। এখানে বাচ্চার সঙ্গে বাবা-মাকে সময় কাটানোর সুযোগ দেয়া হয়। শিশুদের থাকতেও দেয়া হয় সেখানে।
একটা সময় ঘিঞ্জি আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য বদনাম ছিল স্কটল্যান্ডের ‘চ্যাম্প-ডোলোন’ কারাগারের। এমনকি ইউরোপের অন্যতম জনবহুল কারাগারও হয়ে উঠেছিল এটি। তবে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তিত করে একেবারে ঝাঁ চকচকে হয়ে উঠেছে চ্যাম্প-ডিলোন।
ইন্দোনেশিয়ার ‘পনদোক বাম্বু’ কারাগারটি স্বাচ্ছন্দ্য আর বিলাসে অভিজাত হোটেলের থেকে কোনো অংশে কম নয়। সেখানকার প্রতিটি কারাকক্ষে ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), টিভিও রয়েছে। জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ‘জেভিএ ফুহলসবুটেল’ কারাগারে ২০১১ সালে সংস্কার করে প্রতিটি কারাকক্ষে বিছানা, বাথরুম, সম্মেলন কক্ষের (কনফারেন্স রুম) ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া অতিথির থাকার জন্যও আলাদা ব্যবস্থার পাশাপাশি ‘লন্ড্রি’র সুবিধাও রয়েছে। সুইডেনের ‘সোলেনটুনা’ কারাগারে প্রত্যেকের জন্য রয়েছে আলাদা কারাকক্ষ। আর সেই কক্ষে প্রয়োজনীয় সব কিছুরই ব্যবস্থা রয়েছে।
অনেক বন্দিই আছেন যারা নরওয়ের ‘হালডেন’ কারাগারে ঢুকলে আর বেরোতে চান না। সেখানে সব কয়েদির জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ, আর ‘বাথরুম’র পাশাপাশি অবসর কাটানোর নানা ব্যবস্থা। ‘ব্যাস্টয়’ কারাগারটি নরওয়ের ব্যাস্টয় দ্বীপে অবস্থিত। ১০০ জন বন্দি থাকেন এখানে। তবে তাদের দেখলে বন্দি তো মনেই হবে না, বরং মনে হতে পারে যেন একটা বাড়িতে বন্ধুর মতোই ভাড়া থাকেন তারা।
নিউজিল্যান্ডের ‘ওটাগো কারেকশন ফেসিলিটি’ কারাগারের নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই কড়া। এরপরও সেখানে বন্দিদের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে বন্দিদের সমাজে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। আর স্কটল্যান্ডের ‘এইচএমপি অ্যাডিওয়েল’ কারাগার, যেখানে বন্দিদের পড়াশোনা থেকে শুরু নানা ধরনের কাজও শেখানো হয়। সংবাদসূত্র : ডেইলি মেইল, সিএনএন, গার্ডিয়ান

ঝাড়ু হাতে রাস্তায় মেয়র আনিসুল

যাযাদি রিপোর্ট শনিবার রাজধানীর গুলশান লেক পার্কে সড়ক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম উদ্বোধন ও সনদ প্রদান অনুষ্ঠান শেষে ঝাড়ু হাতে রাস্তা পরিষ্কারে অংশ নেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক -যাযাদিপরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযানে ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। শনিবার দুপুরে গুলশান লেক পার্কে সড়ক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধনী ও সনদ প্রদান অনুষ্ঠান শেষে ঝাড়ু হাতে রাস্তা পরিষ্কারে নামেন তিনি।
গুলশান লেক পার্ক সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মেয়র আনিসুল হক বলেন, জনগণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করছেন। আগামী দুই বছরে ডিএনসিসিতে পাঁচ হাজার ২০০ সিসি ক্যামেরা লাগানো হবে। সড়কে এলইডি বাতিও লাগানো হবে। ঢাকা শহর বদলে দেবেন। আগামী ৬-৮ মাসের মধ্যে ট্রাফিক সমস্যা সমাধানে ২১টি ইউলুপ নির্মাণ করা হবে। সব কাজ সময় নিয়ে করছেন। তাতে একটু দেরি হতেই পারে।

তিনি বলেন, বর্তমানে তারা রাজধানীর ৬৩টি এলাকায় ২৫০০ টন বর্জ্য পরিষ্কার করছেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকা শহরকে সিঙ্গাপুর বানানো হবে। কোনো যানজট থাকবে না, থাকবে না অপরিষ্কার কিংবা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও।
এ ক্ষেত্রে সবাইকে সহযোগিতা করার অহ্বান জানিয়ে ডিএনসিসি মেয়র বলেন, মেয়র একা কোনো কাজ করতে পারে না। মেয়রের চারপাশে অনেক হাত। যখন এ হাতগুলো এক হয় তখন মেয়রের শক্তি বেড়ে যায়।
‘তখন সব সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়। ঢাকা শহর বদলানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করছি। অনেক কাজ যে করে ফেলেছি সেটিও কিন্তু নয়। তবে চেষ্টা করছি,’ যোগ করেন আনিসুল হক।
তিনি বলেন, ঢাকায় ২০ হাজার বিলবোর্ডের জঞ্জাল সরানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষে তা সম্ভব হয়েছে সবার সহযোগিতার কারণেই।
সনদ বিতরণ শেষে গুলশান লেক এলাকার সড়কে নিজে ঝাড়ু দিয়ে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন মেয়র আনিসুল হক।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী, ডিএনসিসি’র প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এম আব্দুর রাজ্জাক, গুলশান সোসাইটির সভাপতি ডা. এ টি এম শামসুল হুদা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ডিএনসিসি ও গুলশান সোসাইটির মধ্যে করা সমঝোতা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে গুলশানের ৭০টি অভ্যন্তরীণ সড়কের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
গুলশান সোসাইটির নিযুক্ত ১০০ পরিচ্ছন্নকর্মীর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সড়কগুলো পরিচ্ছন্ন করা হবে। ডিএনসিসির বর্জ্যবাহী গাড়ি স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সড়ক বর্জ্য পরিবহন করে ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাবে। পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে এ উদ্যোগে সহযোগিতা করছে ডিএনসিসি।

তিস্তার ভবিষ্যত

আগামী মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ভারত সফরে আসবেন, তখন ভারত তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছে। ভারত বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীকে সামরিক সাহায্য থেকে সমুদ্র সহায়তা পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক প্রতিশ্রুতি দেবে। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য নদী চুক্তি সম্পাদনে নয়া দিল্লির ব্যর্থতায় অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখে থাকা ঢাকা তার উদ্বেগজনক বার্তা পাঠিয়ে চলছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টেলিগ্রাফকে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার কারণে স্থগিত হয়ে থাকা তিস্তা পানিচুক্তি একটা ছায়াপাত করে রাখলেও নরেন্দ্র মোদি সরকার আশা করছে যে, বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অন্যান্য চুক্তি সম্পাদন করা সম্ভব হবে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, শেখ হাসিনার ৭ই এপ্রিলের সফরকে সামনে রেখে তিস্তা চুক্তি বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হওয়ার জন্য সামান্য সময় অবশিষ্ট রয়েছে। এই চুক্তি সম্পাদন নিয়ে মোদি এবং মমতার মধ্যে গত কয়েক মাস হলো রাজনৈতিক উত্তেজনা উচ্চমাত্রা লাভ করেছে।
কিন্তু শেখ হাসিনার টিম নয়া দিল্লির কাছে এই ইঙ্গিত রেখেছে যে, তিস্তা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের ভেতর থেকে সরকার চাপের মুখে রয়েছে। এই সফরকালে তাই অন্তত যাতে তিস্তা চুক্তি এবং অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন বিষয়ে কিছু অগ্রগতি ঘটেছে, তেমনটা যাতে প্রদর্শন করা সম্ভব হয়। ২০১৮ সালের শেষদিকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শেখ হাসিনাকে তার একদশকের রেকর্ড জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের উষ্ণ পরিবেশ পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অসাধারণভাবে বিকশিত হয়েছে। বর্তমানে নয়া দিল্লি মনে করে ঢাকার সঙ্গে তার বিদ্যমান সম্পর্কই তার সব থেকে সফল প্রতিবেশীসুলভ সুসম্পর্কের মধ্যে অগ্রগণ্য।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলেছেন, শেখ হাসিনা এখন ক্রমবর্ধমানহারে এই সুপারিশের মুখোমুখি হয়েছেন যে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা এবং বর্ধিত ট্রানজিট অধিকারসহ অন্যান্য বিষয়ে ভারতকে খুব বেশি ছাড় দেয়া হয়েছে। অথচ এর বিনিময়ে প্রাপ্তি খুবই অত্যল্প। তিস্তাচুক্তি করতে না পারার ভারতীয় অপারগতা এ সংক্রান্ত সমালোচনার একটি প্রতীকে  (টোটেম) পরিণত হয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক একটি খ্যাতনামা থিংকট্যাংক হলো সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডি’র বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ঢাকা থেকে টেলিগ্রাফকে বলেছেন, বাংলাদেশে এখন এটা একটা সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি যে, সম্পর্কের ক্যালকুলাস বিনিময় এখন ভারতের অনুকূলে যথেষ্ট ভারী হয়ে আছে। আর তাই ভারতেরই তা প্রতিদান (রেসিপ্রোকেট) দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর ভাষায়- ‘বাংলাদেশের জন্য তিস্তা একটি শীর্ষ অগ্রাধিকার এবং এটা একটা গভীর হতাশা যে, ভারত এ বিষয়ে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরসন করতে সম্ভব হচ্ছে না। এবং সে কারণে তার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে পারছে না।’
দুই দেশের আলাপ-আলোচনাকারীরা প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক, যা হবে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম, তা চূড়ান্তকরণের কাজ করছেন। কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন, এ চুক্তি শেখ হাসিনার সফরকালে স্বাক্ষরিত হতে পারে।
এই সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য সামরিক প্রশিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ বিনিময় সহায়তা এবং সামরিক সরঞ্জামের বিষয়ে রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সহযোগিতা হবে বলে কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। এ স্মারকে অবশ্য প্রতিরক্ষা উৎপাদন (ডিফেন্স ম্যানুফেকচার) ও মহাকাশ সহযোগিতায় যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট  ভেঞ্চার) এবং সামুদ্রিক অবকাঠামো খাতে সহ উন্নয়নের বিষয় থাকছে। এছাড়া এতে পরস্পরের বন্দরে জাহাজ ভেড়ার বিষয়ও থাকবে।
ভারত প্রতিরক্ষা সাজ-সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ৫ শ’ মিলিয়ন ডলারের লাইন অব ক্রেডিট দেয়ার প্রস্তাবও দিতে পারে। আর এটা এমন একটি প্রেক্ষাপটে চীন যখন দেশটির প্রতিরক্ষা বাজারে গভীর যোগসূত্র তৈরি করেছে।
মোদি মন্ত্রিসভা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সীমান্ত হাটের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয় অনুমোদন করেছে। এগুলো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের উভয় পাশে পণ্য-দ্রব্য বিক্রির জন্য জনপ্রিয় হাট হিসেবে বিবেচিত। মোদি মন্ত্রিসভা অবশ্য ‘মেরিটাইম সার্ভিলেন্স’ বিষয়ে একটি চুক্তি সম্পাদনও অনুমোদন করেছে। এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় লাইটহাউজগুলো (সমুদ্রে বিপদ সংকেতদানকারী বাতিঘর)  বাংলাদেশি নৌকা ও জাহাজগুলোকে সরাসরি সাহায্য করবে।
কর্মকর্তারা এখানে (দিল্লিতে) বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার সফরকালে দিল্লি যেসব চুক্তি চূড়ান্তভাবে সম্পাদন করবে তার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য এই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক যে একটি প্রধান খুঁটি তারই একটা প্রতিফলন ঘটবে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারত যখন উত্তেজনা মোকাবিলা করছে এবং মালদ্বীপ ও নেপালের সঙ্গে তার সম্পর্কে টানাপোড়েন (টিপ-টোয়িং) চলছে, তখন বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনা নয়া দিল্লির জন্য এক বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গোপাল বাগলে বলেছেন, এটি প্রকৃত অর্থেই একটি মাইলফলক সফরে পরিণত হতে চলেছে। এবং এই সফরটি যাতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল নিয়ে আসে সেজন্য উভয়পক্ষই অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এই সম্পর্ক ২০১৫ সালে অধিকতর মজবুত হয়েছিল, যখন মোদি মমতাকে স্থায়ী সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে তাঁর অনুরূপ বিরোধিতাকে ত্যাগ করাতে রাজি করাতে পেরেছিলেন। সেই চুক্তিটিও তিস্তার মতো বাংলাদেশের জন্য একটি তিক্ত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। সীমান্ত চুক্তি সম্পাদনে মমতা মোদির সঙ্গে ঢাকা সফর করেছিলেন। আর ওই চুক্তির ফলে  দু’দেশের সীমান্তবর্তী এলকায় অবস্থিত ছিটমহল বিনিময় করা সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু  শেখ হাসিনা সরকারের জন্য তিস্তা এখন একটি উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ দল বিএনপি এই সমালোচনা করছে যে, দেশের বর্তমান সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ দিল্লিতে চলতি সপ্তাহে পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে এসে মন্তব্য করেছেন যে, ‘একাদিক্রমে দু’জন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী (মনমোহন সিং এবং নরেন্দ্র মোদি) বলেছেন, তিস্তা সংক্রান্ত প্রস্তাবিত খসড়া একটি চুক্তিতে পরিণত হবে। এবং তারা উভয়েই এ অঙ্গীকার ব্যক্তিগত আলোচনায় নয়, প্রকাশ্যে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন।’
বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞগণ যুক্তি দেন যে, ভারত সাহায্যের জন্য সবসময় এগিয়ে আসেনি।
গত নভেম্বরে বাংলাদেশের কাছে চীনের দু’টি সাবমেরিন হস্তান্তরিত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর একটি সমান্তরাল চাহিদা তালিকা নিয়ে ঢাকা সফরে এলেন, যা বাস্তবায়িত হলে দু’দেশের সম্পর্কের নিরাপত্তাহীনতা উবে যাবে।
সিপিডি’র দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে সাফল্যজনকভাবে ভারতের বাইরে শুধু চীনের সঙ্গেই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, এমনকি সৌদি আরবের সঙ্গেও একটি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের জাল বিস্তার করতে পেরেছেন, যা বিএনপি’র করা সমালোচনার সঙ্গে তাকে যুদ্ধ করতে সাহায্য করেছে।
মি. ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘এখন প্রশ্ন হলো ভারত থেকেও আমরা কি একই রকম পর্যাপ্ত সমর্থন দেখতে পাব? স্পষ্টতই মি. পারিকরের সফর অনেক বাংলাদেশিকে অসন্তুষ্ট করেছে, কারণ সেটা সুসম্পর্ক বিরোধী একটা অবস্থা নির্দেশ করছে।’
ভারতের দি টেলিগ্রাফের সৌজন্যে

সরকার প্রধানকে ভুল না বোঝানোর আহ্বান প্রধান বিচারপতির

সরকার প্রধানকে ভুল না বোঝানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা। তিনি বলেন, একটা মহল সব সময়ই প্রশাসনের সঙ্গে বিচার বিভাগের দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখছে।

প্রধান বিচারপতি অভিযোগ করেন, ‘সরকার প্রধান যারা আছেন, তাদের কাছে ঠিকমতো আমাদের ছোট ছোট সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয় না। বরং উল্টোভাবে পেশ করা হয়।’

শনিবার বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, সংবিধান ও আইনে যে ক্ষমতা দেয়া আছে. বিচার বিভাগকে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেয়া হলে দেশে দুর্নীতি, অপরাধ প্রবণতা, এমনকি সন্ত্রাসমূলক কাজ অনেকাংশে কমে আসতো।

তিন শতাধিক বিচারকের পদ শূন্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিচারক শূন্যতা নিয়ে আমরা সময় মতো চিঠি দেই, কিন্তু সময় মতো প্রশাসনের সহযোগিতা পাই না। এটা হলো নিম্ন পর্যায়ের প্রশাসন। এক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ে একটা ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়।’

‘আশা রাখবো প্রশাসনে যারা আছেন, এ সংক্রান্ত বিষয় যারা ডিল করেন তারা সরকার প্রধানকে ভুল রিপোর্ট সরবারহ করবেন না। সঠিক রিপোর্ট দেবেন যাতে বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক থাকে’ যোগ করেন এস কে সিনহা।

ভুল রিপোর্ট দেয়ার ফলে বিচার বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, উল্টো সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, সরকারের সবচেয়ে একটা বড় জিনিস হলো সুন্দরভাবে আইনশৃংখলা বজায় রাখা। আইনশৃংখলা বজায় রাখতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অপরাধীদের ঠিক মত বিচার করা। সময়মত বিচার না হলে অপরাধী জামিনে বের হয়ে যায়। এরপর সে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

বিচার বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে দু-একজনকে দায়ী করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পাকিস্তান আমল থেকে বিচার বিভাগকে ক্ষতি করেছে আমাদেরই বিচার বিভাগেরই কিছু মানুষ। এর জন্য দু-একজন দায়ী।’

তিনি বলেন, এখন প্রশাসনকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। বলা হয়, বিচার বিভাগ প্রশাসনের প্রতিপক্ষ। এটা অত্যন্ত একটি ভুল ধারণা। প্রত্যেক সরকারের আমলেই কিছু বিষয়ে বাড়াবাড়ি হবে। সে বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই তো বিচার বিভাগ। তা না হলে প্রশাসনের অধীনেই বিচার বিভাগ থেকে যেত, যেটা রাজা-বাদশারা বিচার করেছে। এটা হয়নি কারণ, যাতে কোনো চাপ বা দলীয় চিন্তা-চেতনার ঊর্ধ্বে থেকে বিচার করতে পারে।

এস কে সিনহা বলেন, রাজনৈতিক সরকার রাজনৈতিক চিন্তাধারায় কাজ করবে। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সরকারের লাইন কী হবে, বিচার বিভাগ কী করবে তার লাইন কী হবে- সে ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে শাসনতন্ত্রে বলা আছে।

তিনি বলেন, যখনই দেখা যাবে রাজনৈতিক সরকার ও নেতাদের দ্বারা শাসতন্ত্রের যা বলা আছে তা ঠিকমতো হচ্ছে না, তখনই সুপ্রিমকোর্ট এগিয়ে আসবে। তা হলে সেদেশে সভ্যতা বজায় থাকবে।

এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ দেশের প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি- জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানো কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি।

রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সেমিনার হলে ওই অনুষ্ঠানে জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা।

এছাড়া বক্তব্য রাখেন- বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি খোন্দকার মূসা খালেদ, জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের সদস্য বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ্ত মুখার্জি, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের সচিব পরেশ চন্দ্র শর্ম্মা।

নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ।। ড. বদিউল আলম মজুমদার

বহু জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ৮ই ফেব্রুয়ারি মহামান্য  রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কর্তৃক সাবেক সচিব জনাব কেএম নূরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, সাবেক সচিব মো. রফিকুল ইসলাম, সাবেক জেলা জজ কবিতা খানম এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদাত হোসেন চৌধুরী-কে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠিত হয়েছে। আমরা নবগঠিত নির্বাচন কমিশনকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে পুরো জাতির স্বার্থে আমরা তাঁদের সফলতা কামনা করি। তাঁদের সফলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুজন-এর পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানেরও আশ্বাস জানাই। আশা করি, বিদায়ী রকিবউদ্দীন কমিশনের মতো তাঁরা আমাদের সহযোগিতা নিতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না।
নবগঠিত নূরুল হুদা কমিশন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সফলতা অর্জন করতে হলে তাঁদেরকে এগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জের প্রধান উৎস হলো বিদায়ী রকিবউদ্দীন কমিশনের ব্যর্থতা। সরকারও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের সংখ্যা। আমরা কমিশনের সামনের বড় চ্যালেঞ্জগুলো নিম্নে তুলে ধরছি।
কমিশনারদের সংখ্যা: রকিবউদ্দীন কমিশন ছাড়া অতীতের কোনো নির্বাচন কমিশনেই তিনজনের বেশি সদস্য ছিলেন না এবং এই তিনজনও অনেক সময় একত্রে কাজ করতে পারেননি। পাঁচ সদস্যের নবনিযুক্ত কমিশনারদের সবাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং তাঁদের প্রত্যেকের অনেক বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত থাকাই স্বাভাবিক। দুই-তিনজনের মতামতের মধ্যে সমন্বয় করা যত সহজ পাঁচজনের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি দুরূহ। তাই পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বর্তমান কমিশনের ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি হলো তাদের মধ্যে সম্ভাব্য মতানৈক্য। বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আশা করি নবগঠিত কমিশন এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারবে।
কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা: পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশনের সামনে অন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হলো কমিশনের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা। অনেকেরই স্মরণ আছে যে, অতীতে কমিশনের সচিবালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আইনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়াও আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা দেয়া আছে। তবে সাংবিধানিক নির্দেশনা দিয়ে বা আইন করে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় না। আর কমিশন নিরপেক্ষ হলেই সব দলের জন্য নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে এবং সবাই নির্বাচনে অংশ নিবে। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন না হলে এবং ভোটারদের সামনে বিকল্প না থাকলে তাকে নির্বাচন বলা যায় না, কারণ ‘নির্বাচন’ মানেই বিকল্পের মধ্য থেকে বেছে নেয়া। এছাড়াও, কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব শুধু নির্বাচন করাই নয়, বরং যথাসময়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ তথা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। আশার কথা যে, আমাদের মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইতিমধ্যেই সংবিধানকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। আমরা আশাবাদী হতে চাই যে, তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা প্রদর্শন করবেন।
প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগ: প্রধান নির্বাচন কমিশনার, অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার এবং একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়েই নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০০৮ এবং এর ২০১৬ সালের সংশোধনীও নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এই বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনের সচিব থেকে শুরু করে জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা পদে সরকারি কর্মকতাদের প্রেষণে বদলি করার বিধান রাখা হয়েছে। আর প্রেষণের মাধ্যমে সরকার পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের কমিশনের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে, যা অতীতের সরকারগুলো করেছে। নতুন নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশেষত জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা-সহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে, যেসব পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা নির্বাচনী ফলাফল সরাসরিভাবে প্রভাবিত করতে পারে, কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদেরকে নিয়োগের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার সৃষ্টি করা আবশ্যক।
সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা: আগের শামসুল হুদা কমিশনের নেতৃত্বে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি আরো কঠোর করা হয়েছিল। ভোটারদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে তাদের জন্য তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ‘না-ভোটে’র বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। (প্রসঙ্গত, নবম জাতীয় সংসদ ‘না-ভোটে’র বিধান অনুমোদন করেনি এবং মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের নেতা-কর্মীদের মতামতের প্রাধান্যকে খর্ব করেছে)। রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছিল। নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন নিষিদ্ধ করার বিধানও রাখা হয়েছিল। আরও বিধান রাখা হয়েছিল সকল রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখা বিলুপ্তির। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সকল কমিটিতে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখারও বিধান করা হয়েছিল।
এগুলো ছিল যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংস্কার, যেগুলো প্রণয়নের ক্ষেত্রে সুজন নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছিল। আমরা অনেকগুলো সংস্কার ভাবনা উত্থাপন করেছিলাম এবং একই সঙ্গে এগুলোর ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করেছিলাম। সুজন-এর পক্ষ থেকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের একটি খসড়াও নবগঠিত শামসুল হুদা কমিশনকে প্রদান করা হয়। আমাদের এবং অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত সংস্কার ধারণাগুলো নিয়ে শামসুল হুদা কমিশন তাদের নিজস্ব সংস্কার প্যাকেজ তৈরি করে এবং রাজনৈতিক দল (যদিও বিএনপি এতে অংশগ্রহণ করেনি), নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের পর সেগুলো রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ আকারে জারি করেন।
প্রসঙ্গত, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রণীত ‘দিনবদলের সনদ’- শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী সংস্কার প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছিল। রকিবউদ্দীন কমিশন এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। বরং তারা প্রার্থিতা বাতিলসহ তাদের নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্যোগ নেয়, প্রবল সমালোচনার মুখে যা থেকে তারা বিরত হয়। এছাড়াও তারা স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করে, যা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে ভূমিকা রাখে এবং ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধিকে সীমিত করে। তাই নবগঠিত কমিশনের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা।
আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন: সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হলে আইনি কাঠমোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো হলো: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও); ভোটার তালিকা আইন, ২০১০; নির্বাচনী এলাকা সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০১০; রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১; জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪; নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে আচরণবিধি-সহ আরও অনেকগুলো বিধিমালা। উপরস্তু, স্থানীয় সরকারের সবগুলো আইনেই নির্বাচনী বিধান রয়েছে। এসব আইনে ও বিধি-বিধানে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা নতুন কমিশনের জন্য আইনি কাঠামোতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করছি:
(১) ‘না-ভোটে’র বিধানের পুনঃপ্রবর্তন; (২) মনোনয়নপত্র অনলাইনে দাখিলের বিধান; (৩) জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা ও আয়কর বিবরণী দাখিলের বিধান; (৪) সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে প্রদান; এবং (৫) রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্যদের নাম ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও নিয়মিত আপডেট করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি।
আইনের প্রয়োগ: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আইন ও বিধি-বিধানে সংস্কার করলেই হবে না, নির্বাচন কমিশনকে সেগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এব্যাপারে আমাদের অতীতের নির্বাচন কমিশনগুলোর অপারগতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য তৃণমূল থেকে প্যানেল তৈরির যে আইনি বাধ্যবাধকতা তা প্রায় সব দলই উপেক্ষা করে আসছে। নির্বাচন কমিশনও এ ব্যাপারে কোনোরূপ উচ্চবাচ্য করেনি। এছাড়াও নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত করার বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলো ভ্রূক্ষেপও করছে না, যদিও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন শিক্ষা প্রতিষ্ঠনগুলোতে তাণ্ডব সৃষ্টি করেই চলছে। এছাড়াও আরপিও’র ৯০(গ) ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখা থাকা বেআইনি, যাও রাজনৈতিক দলগুলো অমান্য করেই চলছে। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে আইন-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে।
ভোটার তালিকা: নির্ভুল ভোটার তালিকা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত এবং ভোটার তালিকা তৈরি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ২০০৮ সালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটি ছবিযুক্ত সঠিক ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যে তালিকায় পুরুষের তুলনায় ১৪ লাখের বেশি নারী ভোটার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভোটার তালিকায় হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ‘জেন্ডার-গ্যাপ’ দেখা দিয়েছে, অর্থাৎ পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সর্বশেষ খসড়া হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭২ জন ভোটার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬০ জন, অর্থাৎ নারী-পুরুষের অনুপাত ৪০:৬০ এবং জেন্ডার-গ্যাপ ২০ শতাংশ (বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ৩ জানুয়ারি ২০১৭), যদিও হালনাগাদের মাধ্যমে মোট কত ভোটার তালিকায় সংযুক্ত হয়েছে তা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের হালনাগাদে প্রায় ৪৭ লাখ নতুন ভোটার ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন এবং তখন জেন্ডার-গ্যাপ ছিল ১২ শতাংশ। আমাদের জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের হার প্রায় সমান সমান। এছাড়াও আমাদের প্রায় এক কোটি নাগরিক বিদেশে কর্মরত, যাদের প্রায় সবাই পুরুষ এবং অধিকাংশই ভোটার নন। তাই এটি সুস্পষ্ট যে, হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ভোটার হওয়ার মতো অনেক যোগ্য নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এবং এর বিহিত করার লক্ষ্যে কমিশনকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সীমানা পুনঃনির্ধারণ: নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণও নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কয়েকটি সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করা হয়, যার একটি হলো সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যায় যতদূর সম্ভব সমতা আনা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ৮৭টি নির্বাচনী এলাকায় সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হয়ছে এবং এরফলে ভোটার সংখ্যায় অসমতা আরো বেড়েছে, যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উভয়েরই লঙ্ঘন। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের পর ২০০৮ সালে যেখানে গড় ভোটার সংখ্যার ক্ট২১ শতাংশের মধ্যেকার আসন সংখ্যা ছিল ৮৩টি, সেখানে ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০২টিতে। অর্থাৎ সীমানা পুনঃনির্ধারণের পর আসনওয়ারী ভোটার সংখ্যার তারতম্য আরো বেড়েছে। এছাড়াও রকিবউদ্দীন কমিশনের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে অনেক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল (প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩)। তাই নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের দিকেও কমিশনকে নজর দিতে হবে।
মনোনয়ন: শামসুল হুদা কমিশনের সময়ে অধ্যাদেশ আকারে যে আরপিও জারি করা হয় তাতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রত্যেক সংসদীয় আসনের জন্য একটি প্যানেল তৈরি করার এবং সেটি থেকে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড মনোনয়ন দেয়ার বিধান ছিল। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ কিছু নির্বাচনী এলাকায় এধরনের প্যানেল তৈরি করলেও, বিএনপি আইনের এবিধান সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে। তবে আওয়ামী লীগও সব ক্ষেত্রে তৈরি প্যানেল থেকে মনোনয়ন দেয়নি। তবে অধ্যাদেশটি অনুমোদনের সময়ে নবম সংসদ এ বিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডকে আর তৃণমূলে তৈরি প্যানেল থেকে মনোনয়ন দিতে হবে না, বোর্ডকে তা শুধু বিবেচনায় নিতে হবে। তাই সংসদ নির্বাচনে উড়ে এসে জুড়ে বসার সমস্যা দূর করতে হলে মনোনয়নের ক্ষেত্রে আগের অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত বিধানটি ফিরিয়ে আনা জরুরি এবং নতুন কমিশনকে এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
হলফনামা: সুজন-এর প্রচেষ্টায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছাড়া আর সব নির্বাচনেই ভোটারদের অবগতির জন্য প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়ের উৎস, ফৌজদারি অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগের বিবরণ, নিজেদের এবং নির্ভরশীলদের সম্পদের হিসাব প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায়ে সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে এসব তথ্য ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও, কমিশন তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে প্রায় সব নির্বাচনেই হলফনামায় প্রদত্ত এসব তথ্যের তূলনামূলক চিত্র তৈরি করে তা বিতরণ করেছি, ভোটারদের কাছে যা ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। (দেখুন: যঃঃঢ়://াড়ঃবনফ.ড়ৎম)। গণমাধ্যমও এখন একাজে এগিয়ে এসেছে এবং আনন্দের কথা যে, এটি এখন একটি আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
তবে হলফনামার ছকে গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, এতে স্থাবর সম্পদের হিসাব ক্রয় মূল্যে প্রদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে, যাতে প্রার্থীর ও প্রার্থীর নির্ভরশীলদের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও আমরা মনে করি যে, হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে অসমাপ্ত হলফনামা প্রদানকারী, তথ্য গোপনকারী ও ভুল তথ্য প্রদানকারীর প্রার্থিতা বাতিল কিংবা তাদের নির্বাচন বাতিল করলে অনেক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের নির্বাচনী অঙ্গন থেকে দূরে রাখা যাবে এবং আমাদের রাজনীতি বহুলাংশে কলুষমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তাই নবগঠিত কমিশনকে আমরা হলফনামার ছকটিতে পরিবর্তন আনার এবং হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যগুলো কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করছি। একই সঙ্গে প্রার্থীরা যেন আয়কর বিবরণীর পরিবর্তে শুধুমাত্র প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে পার পেয়ে না যান, কমিশনকে তা নিশ্চিত করারও আমরা অনুরোধ করছি। নির্বাচন কমিশনকে প্রার্থী কর্তৃক হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যসমূহ ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করারও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
নির্বাচনী ব্যয়: নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ সীমা ক্রমাগতই বেড়ে যাচ্ছে – রকিবউদ্দীন কমিশন এই সীমাকে ১৫ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকা করেছে। তা সত্ত্বেও নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের খবর আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। বস্তুত নির্বাচন- সব স্তরের নির্বাচন – এখন টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে এবং আমাদের গণতন্ত্র হয়ে পড়েছে ‘বেস্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই’ বা টাকা দিয়ে কেনা যায় এমন উত্তম গণতন্ত্র। ফলে শুধুমাত্র জাতীয় সংসদই নয়, এমনকি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত। বস্তুত আমাদের দেশে রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ হয়েছে এবং ব্যবসায়ের রাজনীতিকরণ হয়েছে। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ সীমা কমাতে হবে, যাতে ভোটাধিকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হবার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রার্থী কর্তৃক পোস্টার-লিফলেট ছাপানো ও সকল ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রার্থীদের পোস্টার ছাপানো ও প্রচার এবং সকল প্রার্থীকে এক মঞ্চে এনে প্রজেকশন মিটিং আয়োজনের মধ্য দিয়েও নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
মনোনয়ন বাণিজ্য: মনোনয়ন বাণিজ্য আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আজ এক ধরনের প্রহসনে পরিণত করে ফেলেছে। অতীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা আমরা শুনেছি, কিন্তু দলভিত্তিক নির্বাচনের কারণে এ ব্যধি এখন স্থানীয় সরকার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে এর অবসান আবশ্যক এবং আমরা আশা করি যে, নতুন কমিশন এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। তৃণমূল থেকে মনোনয়ন প্রদানের বিধান কার্যকর হলেই মনোনয়ন বাণিজ্য ক্রমশ হ্রাস পাবে বলে আমরা মনে করি।
রাজনৈতিক দলের হিসাব-নিকাশ: নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের অডিট করা আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রতি বছর নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। আমরা তথ্য অধিকার আইনের অধীনে এগুলো কমিশনের কাছে চেয়েও পাইনি। এমনকি তথ্য কমিশনে গিয়েও এর প্রতিকার পাইনি। এরপর উচ্চ আদালতে গিয়ে আমরা যে রায় পেয়েছি তাতে বলা হয়েছে, যে কোনো ‘কর্তৃপক্ষে’র কাছে থাকা সব তথ্যই, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, ‘পাবলিক ইনফরমেশন,’ যেগুলো পাওয়ার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। (দেখুন: যঃঃঢ়://িি.িংঁঢ়ৎবসবপড়ঁৎঃ.মড়া.নফ/ৎবংড়ঁৎপবং/ফড়পঁসবহঃং/৮১৪৪৬২থড.চ৭৯৮ড়ভ২০১৫.ঢ়ফভ) আশা করি, কমিশন বিষয়টি স্মরণে রাখবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধে রাজনৈতিক দলের অর্থের উৎসের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবে। প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী ভারতে এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসা: সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনী বিরোধের দ্রুত মীমাংসা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচনী বিরোধ সংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তির ব্যাপারে ব্যাপক দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী মামলা সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও নিষ্পত্তি হয় না। এ ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা নির্বাচনী অপরাধকেই উৎসাহিত করে। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনী বিরোধ-মীমাংসার লক্ষ্যে বিশেষ (নির্বাচনী) ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করার লক্ষ্যে কমিশনকে উচ্চ আদালতের সহায়তা নিতে হবে।
সহিংসতা বোধ: শামসুল হুদা কমিশনের সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা ছিল না বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। সেই কমিশনের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীরাও আইন-কানুন মানা শুরু করেছিল। কিন্তু রকিবউদ্দীন কমিশনের মেয়াদকালে নির্বাচনী সহিংসতা বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছে। যেমন, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় ১৫০ জন নিহত হয়েছেন, বহু ব্যক্তি আহত হয়েছেন এবং ব্যাপক জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী সহিংসতা রোধেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আচরণবিধি: প্রত্যেক নির্বাচনের জন্যই নির্বাচন কমিশন একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করে, সংশ্লিষ্টরা তা মেনে চললে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু রকিবউদ্দীন কমিশনের মেয়াদকালে রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীরা আচরণবিধি অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করেছে এবং নির্বাচন কমিশনও এ ব্যাপারে কঠোরতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই পুনর্গঠিত কমিশনকে এ ব্যাপারে নজর দিতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১৯৯০ সালে প্রণীত ‘তিন জোটের রূপরেখা’য় অন্তর্ভুক্ত আচরণবিধিটি কাজে লাগানোর উদ্যোগও কমিশন নিতে পারে। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করার প্রবণতা অনেকদিন থেকেই অব্যাহত রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার বিষয়টিও নির্বাচনী আচরণবিধির আওতায় আনা এখন জরুরি।
আইন ও বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা: রকিবউদ্দীন কমিশন আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের প্রতি চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোটার তালিকা হালনাগাদের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের জন্য কয়েকটি সুস্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে: (১) প্রতিবছর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে; (২) জানুয়ারি মাসে হালনাগাদের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে; (৩) হালনাগাদের তথ্য সংগ্রহকারীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে; (৪) ১৮ বছরের কম বয়সীদের নিবন্ধন করতে কমিশনের আইনগত কোনো ক্ষমতা নেই; (৫) হালনাগাদ করা তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে; এবং (৬) কেউ ভোটার তালিকার কপি চাইলে কমিশনকে তা সরবরাহ করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত আইনি এসব বাধ্যবাধকতার একটিও রকিবউদ্দীন কমিশন মানেনি (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫)। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও নির্বাচনী অভিযোগ নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য তাদেরকে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও করতে হয়েছে। এছাড়াও, প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা এবং কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের ফলাফল সময়মতো এবং অনেক সময় কমিশনের ওয়েবসাইটে থাকে না। এদিকেও কমিশনের নজর দিতে হবে।
আইন প্রণয়ন: আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের বিধি-বিধান সুনির্দিষ্ট করার লক্ষ্যে একটি আইন করার নির্দেশনা রয়েছে, গত ৪৫ বছরেও যা বাস্তবায়িত হয়নি। বিগত নির্বাচন কমিশন এ লক্ষ্যে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে রেখে গিয়েছে, যেটি সম্পর্কে রকিবউদ্দীন কমিশন কোনোরূপ উদ্যোগই নেয়নি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন অতি জরুরি, তাই নতুন কমিশনকে এ ব্যাপারে মনযোগী হতে হবে। ভবিষ্যতে কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিতর্ক এড়াতে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কমিশনকে আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করতে হবে এবং এটিকে আইনে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকারকে রাজি করাতে হবে। প্রস্তাবিত আইনে মোটাদাগে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা আবশ্যক: (১) কমিশনের কার্যপরিধি, দায়িত্ব ও ক্ষমতা; (২) প্রধান নির্বাচন কমিশনারও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মানদণ্ড; (৩) অনুসন্ধান কমিটির গঠন পদ্ধতি; এবং (৪) কমিশনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা।
নির্বাচন ইভিএম-এর ব্যবহার: বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। এর একটি কারণ আস্থাহীনতা। আমরা মনে করি, তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই, কারণ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হলে তথ্য-প্রযুক্তির মহাসড়কে দ্রুততার সাথে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সকল দলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।
সরকারের ও রাজনৈতিক দলের সদাচারণ: সবচেয়ে নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও সাহসী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়, যদি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকার নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল আচরণ না করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন না করে। বস্তুত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত বা ‘নেসেসারি কন্ডিশন’, কিন্তু যথেষ্ট বা ‘সাফিসিয়েন্ট কন্ডিশন’ নয়। অর্থাৎ নির্বাচনকালীন সরকারের সদাচারণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সহায়তা ও সদাচারণ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি ঐকমত্য জরুরি।
পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে, বিগত রকিবউদ্দীন কমিশনের ব্যর্থতা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে খাদে ফেলে দিয়েছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক জন-অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে আমাদের রাজনীতিতে অনেকগুলো জটিলতা দেখা দিয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আমাদের ঘাড়ে পড়তে শুরু করেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ভবিষ্যতে বিতর্কিত নির্বাচন এড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা আশা করি, নবগঠিত নির্বাচন কমিশন তাদের সততা, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা প্রদর্শন করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হবেন। তাঁদের প্রতি আমাদের শুভকামনা ও সহায়তার আশ্বাস রইল। আর তাঁরা সফল না হলে এর দায় সরকার ও অনুসন্ধান কমিটিকেও নিতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক