‘আত্মঘাতী হামলায়’ ইন্ধন পাচ্ছে ভার্চুয়াল যোগাযোগ মাধ্যমে

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল নব্য জেএমবির জঙ্গিরা। কিন্তু যখনই দেশীয় জঙ্গিরা হতাশ হচ্ছে, তখনই আইএস অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থানকারী জঙ্গিরা তাদের আবার উজ্জীবিত করছে। আর এটি সম্ভব হচ্ছে ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে। যাকে সহজে বলা হয়, ইন্টারনেটভিত্তিক নানামুখী যোগাযোগ। এ মাধ্যম ব্যবহার করে নানাভাবে উসকানি দেয়া ছাড়াও আত্মঘাতী হামলা চালানোর ইন্ধন দিচ্ছে আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে যাওয়া জঙ্গিরা।

এছাড়া এর নেপথ্যে বিদেশী কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে। যারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের উন্নতি চায় না। তারা কাটআউট পদ্ধতিতে জঙ্গি তৎপরতা বহাল রেখে এখানকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করা ছড়াও সব সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা জিইয়ে রাখতে চায়।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বায়নের এ যুগে সাইবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে আইএসের কোনো জঙ্গির সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকতে পারে। এটা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ নয়। নব্য জেএমবি আইএসের মতাদর্শ অনুসরণ করে। এ কারণে আইএসের মাধ্যমে তারা উজ্জীবিত হয়।

গোয়েন্দারা বলছেন, বাংলাদেশে হামলার সঙ্গে যুক্ত জঙ্গিরা হোমগ্রোন হলেও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারী জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের ভার্চুয়াল যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গোপন অ্যাপসে তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হচ্ছে।

বিশ্লেষকরাও বলছেন, দেশে আইএসের কোনো কার্যক্রম নেই। তবে দেশীয় জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসের কোনো কোনো জঙ্গির ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে। তাই শুধু জঙ্গি দমন কর্মসূচি দিয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকে যাবে। এজন্য প্রথমে পারিবারিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এরপর সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে এদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে সুফল পাওয়া যাবে না।

পুলিশের জঙ্গি দমন বিভাগ কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) বলছে, ভাটারার দুই ভাই ইব্রাহীম হাসান খান ও জুনায়েদ খান সৌদি আরব থেকে নিখোঁজ হয়। তাদের মধ্যে ইব্রাহীম সিরিয়ায় থেকে দেশীয় জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। সে ফেসবুকেও সক্রিয় রয়েছে।

জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক বাংলাদেশী যুবক সাইফুল্লাহ ওজাকি সিরিয়া থেকে দেশের অনেক জঙ্গির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালে চিকিৎসক রোকন উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরাও দেশীয় জঙ্গিদের ভার্চুয়ালি উজ্জীবিত করছে। এদিকে তাহমিদ সাফি ও আরাফাত রহমানসহ অনেক জঙ্গি আইএসে যোগ দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি ডেরায় থেকে দেশীয় জঙ্গিদের উসকে দিচ্ছে। কতজন বাংলাদেশী আইএসে যোগ দিয়েছে এর সঠিক কোনো সংখ্যা জানা নেই গোয়েন্দাদের। তবে এ সংখ্যা ৫০-এর বেশি নয় বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিদের শুধু উজ্জীবিত করলেই তারা হামলা চালাতে সক্ষম হবে না। এজন্য তাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও বিস্ফোরকের জোগান দেয়া ছাড়াও অর্থের সংস্থান থাকতে হবে। নব্য জেএমবির শীর্ষ কয়েক জঙ্গি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার কারণে অস্ত্র ও বিস্ফোরকের জোগান বন্ধ করা যাচ্ছে না।

বিশেষ করে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী ভয়ংকর জঙ্গি সোহেল মাহফুজ ওরফে হাত কাটা মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর এবং মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি তারা জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ তিন জঙ্গি বোমা, গ্রেনেড এবং আত্মঘাতী হামলার সুইসাইডাল ভেস্ট তৈরিতে পারদর্শী। আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তাছাড়া ভারতে অবস্থানকারী অনেক জঙ্গির সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখে। তারা নিজেরাও অবৈধভাবে ভারতে আসা-যাওয়া করে।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ডিসি মহিবুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গিদের অস্ত্র ও বিস্ফোরকের জোগান বন্ধে কাজ করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অস্ত্র ও বিস্ফোরকের উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মূলত ভার্চুয়াল যোগাযোগ জঙ্গিদের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এ কারণে এখন এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জঙ্গি দমনে রাজনৈতিক মতৈক্য দরকার : বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিরোধের মাধ্যমে জঙ্গি দমন সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক মতৈক্য।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জঙ্গিদের আত্মঘাতী হামলার ঘটনা জাতীয় জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক ও আশংকাজনক। দেশকে অস্থিতিশীল করতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। কয়েক দিন আগে সীতাকুণ্ডের ঘটনা বা তারও আগে ঢাকার আশকোনায় মহিলা জঙ্গির শরীরে বোমা বেঁধে হামলার ঘটনা বিবেচনা করলে দেখা যাবে জঙ্গিরা শারীরিক ও মানসিকভাবে আত্মঘাতী হামলা চালাতে তৈরি। যে কোনো সময় বড় ধরনের নাশকতা ঘটাতে প্রস্তুত।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যেহেতু আইনশৃংখলা বাহিনী বলছে, জঙ্গি দমনে সর্বাগ্রে জনমত সৃষ্টির পাশাপাশি রাজনৈতিক মতৈক্য দরকার। রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করলে অনেক দ্রুত সুফল পাওয়া যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই জনমত গড়ে উঠছে না। দেখা গেছে, সরকার ও আইনশৃংখলা বাহিনী যা বলে তার অধিকাংশই জনগণ বিশ্বাস করতে চায় না।

তিনি মনে করেন, আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে পুরো জঙ্গি নেটওয়ার্ক এখনও ধরা পড়েনি। এদের মদদদাতা, অর্থদাতা ও শিক্ষা গুরুরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। এ কারণে কয়েক দিন পরপর প্রতিশোধ নিতে এরা হামলা চালাচ্ছে। জঙ্গিদের মূলোৎপাটন করতে চাইলে সর্বপ্রথম এদের চিহ্নিত করতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, সন্ত্রাসবাদ বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণেই এটির উদ্ভব। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ এখন যে জায়গায় এসেছে তা দিয়ে রাতারাতি উত্তরণ সম্ভব নয়। তারপরও জনবলসহ অন্যান্য ঘাটতি ছাপিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনী জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় দক্ষতা দেখিয়েছে।