Three music tracks of the Concert for Bangladesh

The Concert for Bangladesh was originally spelled a pair of benefit concerts organized by former Beatles guitarist George Harrison and Indian sitar player Ravi Shankar. The shows were held at 2:30 and 8:00 pm on Sunday, 1 August 1971, at Madison Square Garden in New York City, to raise international awareness of, and fund relief for refugees from East Pakistan, following the Bangladesh Liberation War-related genocide. The concerts were followed by a bestselling live album, a boxed three-record set, and Apple Films‘ concert documentary, which opened in cinemas in the spring of 1972.

অমর বিপ্লবী সোমেন চন্দ হত্যাকাণ্ডের ৭৭তম বর্ষপূর্তিতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।

“লোকটি খুব তাড়াতাড়ি পল্টনের মাঠ পার হচ্ছিল। বোধ হয় ভেবেছিল, লেভেল ক্রসিং-এর কাছ দিয়ে রেলওয়ে ইয়ার্ড পড়ে নিরাপদে নাজিরাবাজার চলে যাবে। তাহার হাতের কাছে বা কিছু দূরে একটা লোকও দেখা যায় না-সব শূন্য, মরুভূমির মতো শূন্য। দূরে পিচঢালা পথের উপর দিয়ে মাঝে মাঝে দুই-একটা সুদৃশ্য মোটরকার হুস করে চলে যায় বটে, কিন্তু এত তীব্র বেগে যায় যে মনে হয় যেন এইমাত্র কেউ তাকেও ছুরি মেরেছে, আর সেই ছোরার ক্ষত হাত দিয়ে চেপে ধরে পাগলের মতো ছুটে চলেছে। নির্জন রাস্তার ওপর মটরগাড়ির এমনি যাতায়াত আরও ভয়াবহ মনে হয়। দূরে গবর্নর হাউজের গর্বময় গাম্ভীর্য মানুষকে উপহাস করে। পথের পাশে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতা মৃদু আন্দোলিত হচ্ছে। মাঠের উপর কয়েকটা কাক কিসের আশায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। অনেক দূরে একটা ইঁদুরের মতো ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে কে? একটি সৈন্য। ঐ সৈন্যটি আজ তিনদিন ধরে এক জায়গায় ডিউটি দিয়ে আসছে।

লোকটা মাঠ ছেড়ে রাস্তায় পড়লো। তার পড়নে ছেঁড়া ময়লা একখানা লুঙ্গি, কাঁধে ততোধিক ময়লা একটি গামছা, মাথার চুলগুলি কাকের বাসার মতো উস্কোখুস্কো, মুখটি করুন। তার পায়ে অনেক ধুলো জমেছে, কোন গ্রামবাসী মনে হয়।

এমন সময় কথাবার্তা নেই দুটি ছেলে এসে হাজির, তাদের মধ্যে একজন কোমর থেকে একটা ছোরা বের করে লোকটার পেছনে একবার বসিয়ে দিল। লোকটা আর্তনাদ করে উঠল, ছেলেটি এতটুকু বিচলিত হলো না, লোকটার গায়ে যেখানে-সেখানে আরও তিনবার ছোরা মেরে তারপর ছুটে পালালো, কুকুর যেমন লেজ তুলে পালায় তেমনি ছুটে পালালো। লোকটা আর্তনাদ করতে করতে গেটের কাছে গিয়ে পড়লো, তার সমস্ত শরীর রক্তে ভিজে গেছে, টাটকা লাল রক্ত, একটু আগে দেখেও মনে হয়নি এত রক্ত ঐ কংকালসার দেহে আছে।”

~১৯৪২ সনের ৮ই মার্চে ফ্যাসিবাদ বিরোধী এক মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় নৃসংশরূপে শহীদ হওয়া সোমেন চন্দের “দাঙ্গা” গল্পের সূচনা ‘দাঙ্গা’ গল্পটি শুরু হয়েছে ঠিক এভাবেই, দাঙ্গার একটা ভয়াবহ চিত্র এখানে অঙ্কিত হয়েছে সাবলীলভাবে, ঢাকার চলমান পরিস্থিতি। পাঠক দেখতে পায়, দুটো ছেলে এবং একজন কোমর থেকে ছোরা বার করে লোকটার পেছনে বসিয়ে দেয়, তারপর বোঝা গেল দাঙ্গার সূত্রপাত। অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়েছে, যে ব্যক্তিটি অশোকের পিতা, তারপর দুই ভাইয়ের মধ্যে যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথোপকথন তা দাঙ্গার বিষয়ে অবগত করেছে, দাঙ্গা শুধু ক্ষয়ক্ষতিই করে না, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিভেদ সৃষ্টি হয় না, একটা ক্ষত তৈরি করে দেয়, যে ক্ষত হয়তো জীবনে আর পূরণ হয় না।
‘দাঙ্গা’ গল্পটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘সংকেত ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থে।

অমর বিপ্লবী সোমেন চন্দের হত্যাকাণ্ডের ৭৭তম বছর

(১)
তাঁর জন্ম ১৯২০ সালের ২৪ মে ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গার পশ্চিম পাড়ে শুভাড্ডা ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামে, মামার বাড়িতে (তথ্য ভেদে নরসিংদী জেলার আশুলিয়া গ্রামে)। তবে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সোমেন চন্দ (জীবনী গ্রন্থমালা) বইয়ে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন, ‘সোমেন চন্দের জন্ম কেরানীগঞ্জ থানার অধীনস্থ পারজুয়ার এলাকায় অবস্থিত ধিতপুর গ্রামে।’ তাঁর বাবার নাম নরেন্দ্রকুমার চন্দ, আর মায়ের নাম হিরণবালা। সোমেন চন্দের পিতামহের নাম রামকুমার। নরেন্দ্রকুমার চন্দের আদিনিবাস ছিল তৎকালীন ঢাকার অন্তর্ভুক্ত নরসিংদী জেলার বালিয়া গ্রামে।
ঢাকার মিডফোর্ড মেডিকেল স্কুল ও হাসপাতালের স্টোর্স বিভাগে চাকরি করতেন নরেন্দ্রকুমার চন্দ। মা হিরণবালা ছিলেন কেরানীগঞ্জের মেয়ে। মাত্র চার বছর বয়সে সোমেন চন্দ তাঁর মাকে হারান। হিরণবালার মৃত্যুর পর নরেন্দ্রকুমার শিশু ছেলে সোমেনকে লালন-পালনের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদান্ত নেন। অবশেষে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তিন মাইল পশ্চিমে ধউর গ্রামের ডা. শরৎচন্দ্র বসুর মেয়ে সরযূদেবীকে বিয়ে করেন। সোমেন এই সৎমা সরযূদেবীকেই মা বলে জানতেন। আর সরযূদেবীও সোমেনকে নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছেন। বাবার চাকরির কারণে ঢাকাতেই সোমেনের বেড়ে ওঠা। এখানেই তাঁর শৈশব-কৈশোর ও মানস চেতনা গড়ে ওঠে। সোমেন চন্দ শহরের বাইরে অর্থাৎ গ্রামে একনাগাড়ে কখনো বসবাস করেননি। তবে মাঝে মাঝে তিনি মামাবাড়ি ধউর গ্রামে বেড়াতে যেতেন। তাঁর শৈশব-কৈশোর বেশ খানিকটা সময় কাটে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে।
সোমেন চন্দের পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারে। বিশেষ করে বাবার কাছে। তারপর পড়েন অশ্বিনীকুমার দত্ত মহাশয়ের কাছে। প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে ১৯৩০ সালে তাঁকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেওয়া হয় পুরান ঢাকার পোগোজ হাই স্কুলে। এই স্কুল থেকে ১৯৩৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হন ঢাকা মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে। কিন্তু খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে অর্থাৎ ডাবল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আগেই পড়াশোনায় ইস্তফা দেন।
আন্দামান-ফেরত মার্কসবাদী নেতা সতীশ পাকড়াশীর সাথে পরিচয় সোমেন চন্দের রাজনৈতিক নিশানা নির্দিষ্ট করে দেয়। তিনি যেন এ পথটাই খুঁজছিলেন। ১৯৩৭ সালের দিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির কমিউনিস্ট পাঠচক্রে যোগ দিয়ে মার্কসবাদী তত্ত্বে মানব মুক্তির সূত্র খুঁজে পান সোমেন। গড়ে তোলেন পুরান ঢাকার দক্ষিণ মৈশুণ্ডীর প্রগতি পাঠাগার। রাজনীতির ব্যাপক কর্মকাণ্ডে প্রবেশের পূর্বে তিনি গল্প, কবিতা লিখতেন। মার্কসবাদীদের কাছে শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতির দীক্ষা পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকেন। জ্ঞান চক্রবর্তীর মতে, কেবল কলম নিয়ে বসে থাকাকে তিনি দায়িত্ব এড়ানোই মনে করতেন। তাই তিনি প্রগতিশীল ভাবধারা বিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রগতি পাঠাগার গড়ে তোলেন।
(২)
১৯৩৫ সালে বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদের উত্থানের প্রেক্ষাপটে উদ্ভুত আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবিরোধী লেখক সংস্থার পথ ধরে ’৩৯সালে ঢাকায় যে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ গঠিত হয়, সেখানেও সোমেন প্রধান উদ্যোগীর ভূমিকা পালন করেন। এ সংগঠনের তিনি সম্পাদক ছিলেন। এরপর তিনি রেল শ্রমিকদের মাঝে কাজ শুরু করেন। শ্রমিকদের সুখ-দুঃখ, নানা সমস্যা অনুধাবন, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি দ্রুততম সময়ে তাঁদের আপনজনে পরিণত হন। ’৪১ সালে তাঁকে পূর্ব বাংলা রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক করা হয় ।
বই খোঁজার আগ্রহ থেকেই সোমেন চন্দ পাঠাগারমুখী হন শিশুকাল থেকে। ঢাকার জোড়পুল লেনের প্রগতি পাঠাগার ছিল সাম্যবাদে বিশ্বাসী মানুষদের পরিচালিত। পাঠাগারে পড়তে পড়তে সোমেন বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং অনুরক্ত হয়ে পড়েন কার্ল মার্কসের তত্ত্বে। ১৯৩৭ সালে সোমেন প্রত্যক্ষভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ওই সময় তিনি কমিউনিস্ট পাঠচক্রের সম্মুখ প্রতিষ্ঠান প্রগতি পাঠাগারের পরিচালকের দায়িত্ব নেন। এ সময় তিনি ও তাঁর পরিবার পুরান ঢাকার দক্ষিণ মৈশণ্ডিতে থাকতেন। প্রগতি পাঠাগারের পরিচালক হন তিনি ১৯৩৮ সালে। এ সময় তিনি বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর মতো আজীবন বিপ্লবী শিক্ষকের রাজনীতি ও দর্শনের পাঠ নেন। রণেশ দাশগুপ্তের সান্নিধ্যে থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, ম্যাক্সিম গোর্কি, মোপাঁসা, রঁলা, বারবুস, জিদ, মারলোসহ আরো অনেকের লেখা বই পড়েন।
(৩)
স্কুলজীবন থেকেই গল্প লিখতেন সোমেন। তখন তাঁর প্রকাশিত লেখা বা নতুন লেখার কথা পরিবারের কেউ জানতেন না। ১৯৩৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশ পায় সোমেনের প্রথম গল্প ‘শিশু তপন’। এরপর আরো উল্লেখযোগ্য কিছু লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ওই বছরেই প্রকাশিত হয়। এই ১৭ বছরেই বাংলাদেশে বন্যার যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভোগ, তা নিয়ে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাস ‘বন্যা’ লেখেন সোমেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় নবশক্তি পত্রিকায়।
১৯৩৫ সালের নভেম্বরে লন্ডনে ভারতীয় ও ব্রিটিশ লেখকদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ই এম ফরস্টার, হ্যারল্ড লাস্কি, হার্বাট রিড, রজনী পাম দত্ত, সাজ্জাদ জহির, মূলক রাজ আনন্দ, ভবানী ভট্টাচার্য প্রমুখ। নানা আলোচনার পর তারা একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন ডিসেম্বরে। এরই সূত্র ধরে ভারতে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ গঠিত হয়। চার বছর পর ঢাকায় স্থাপিত হয় এর শাখা। লন্ডন বৈঠকে সাহিত্যিকরা এ সংগঠনের নাম ‘প্রগতি সাহিত্য সংঘ’ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যখন ইশতেহার প্রকাশিত হয় তখন প্রস্তাবিত নাম রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিলের এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিখ্যাত হিন্দি লেখক মুন্সী প্রেমচাঁদ। সভায় সংগঠনের নামকরণ করা হয় ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’। এর সভাপতি নির্বাচিত হন প্রেমচাঁদ, সম্পাদক সাজ্জাদ জহির।
(৪)
সোমেন ‘প্রগতি লেখক সংঘ’-তে যোগ দেন এবং যুক্ত হোন মার্কসবাদী রাজনীতি ও সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে। বাংলা সাহিত্যে প্রথম গণসাহিত্যের ওপর কাজ করেন তিনি। ১৯৪১ সালে সোমেন চন্দ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক নির্বাচিত হন। অনন্য মেধাবী সোমেন চন্দের লেখা সাধারণত প্রগতি লেখক সংঘের সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক সভাসমূহে পাঠ করা হতো। ১৯৪০ সালে তাঁর ‘বনস্পতি’ গল্পটি ‘ক্রান্তি’ পত্রিকায় ছাপা হয়। ১৯৪১ সালের দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে সোমেন গল্প লেখেন দাঙ্গা। মৃত্যুর পর বিভিন্ন গল্প সংকলন ছাপা হয় তাঁর। ১৯৭৩ সালে রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর গল্পসমূহের একটি সংকলন সম্পাদনা করেন। তাঁর ‘ইঁদুর’ গল্পটি অনূদিত হয় বিভিন্ন ভাষায়। সোমেন চন্দ পুরস্কারের প্রবর্তন করে কলকাতার বাংলা একাডেমি।
তারুণ্যের গান, সৃষ্টির উন্মাদনা ও বিদ্রোহের অগ্নি জ্বেলে সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন সোমেন চন্দ। তাঁর সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘নিজস্ব একটি জীবনদর্শন না থাকলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। সোমেন চন্দ ছিল কমিউনিস্ট। সাহিত্যিক হিসেবেও তার রচনায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে কমিউনিজমের জয়ধ্বনি।’
অন্যায়, অত্যাচার, অসঙ্গতি ও অসহায়ত্বের কাছে কখনো মাথা নত করেননি সোমেন। সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। রাজপথে শোষিত মানুষের অধিকার আদায় ও শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সংগ্রাম আর লেখালেখির মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতি তুলে আনার অবিচল প্রত্যয়ে তিনি ছিলেন ইস্পাতদৃঢ়। সোমেন চন্দের সাহিত্যে ছিল কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষকে ঘিরে। শোষণ-বৈষম্য থেকে মানুষকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন সেই শৈশব থেকে। ইস্পাতদৃঢ় সংকল্প নিয়ে শোষণমুক্তির লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। সোমেন চন্দ এমন একটি মানুষ, যার সৃষ্টি হতাশাগ্রস্ত প্রতিটি মানুষকে জাগ্রত করে নতুন উদ্যমে পথ চলতে সহয়তা করে।
(৫)
১৯৪১ সালের ২২ জুন। হিটলার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে। বিশ্বযুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেয়। এ সময় ভারত উপমহাদেশের প্রগতিবাদী জনতা ফ্যাসিস্ট হিটলারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং স্তালিনের নেতৃত্বে সংগ্রামরত দেশপ্রেমিক সোভিয়েত যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জনযুদ্ধ ঘোষণা করে। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শান্তির লক্ষ্যে হীরেন মুখোপাধ্যায় ও স্নেহাংশু আচার্যকে আহ্বায়ক করে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে বঙ্গদেশে গড়ে ওঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এই সমিতির প্রধান প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটা অন্যতম কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার অগ্রগতি প্রসঙ্গে চিত্রপ্রদর্শনী করা। এই প্রদর্শনীতে প্রগতি লেখক সঙ্ঘের সোমেন চন্দের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁর অবিরত শ্রমের কারণে ঢাকায় অল্পদিনের মধ্যে প্রগতি লেখক সঙ্ঘ ও সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিল অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবী, লেখক প্রভৃতি শহরে এক ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহ্বান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিসেবে যান। সম্মেলন উপলক্ষে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক মহল প্রায় তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয় যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয় যারা মোটামুটিভাবে তুষ্ণীভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়েছিলেন। শেষোক্তদের মধ্যে প্রধানত কংগ্রেস মতবাদের অনুসারীরা ও দ্বিতীয় দলে ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী, বিশেষত শ্রীসংঘ ও বিভির লোকেরা।

ওই দিন ঢাকার সূত্রাপুরে সেবাশ্রম ও লক্ষ্মীবাজারের হৃষিকেশ দাস লেনের কাছে সম্পাদক সোমেন চন্দ রেল শ্রমিকদের মিছিল নিয়ে যখন সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তখন সোমেন চন্দ এর উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়।

সে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য রেল শ্রমিকদের একটি মিছিল নিয়ে তিনি সূত্রাপুরে যাচ্ছিলেন। রেল শ্রমিক ইউনিয়নের তিনি ছিলেন সাধারণ সম্পাদক।

মিছিলটি লক্ষ্মীবাজার হৃষিকেশ দাস লেন মোড়ে গেলে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টির (আরআরপি) গুন্ডারা তাঁর উপর অতর্কিত আক্রমণ করে তাঁকে নির্মম ভাবে হত্যা করে তার চোখ উপড়ে ফেলে, ভোজালী দিয়ে তার পেট চিরে নাড়ি-ভূঁড়ি বের করে নেয়। যে জিভ দিয়ে তিনি শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের জয়গান করতেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী স্লোগান দিতেন, তাঁর সেই জিভ টেনে বের করে কেটে ফেলে দেয় । গুন্ডা বাহিনী সোমেনের দেহ নিথর নিস্তব্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর চারপাশে আনন্দ উল্লাস করে।

২২ বছরের তরুণ সোমেন চন্দ নির্মমভাবে খুন হন। খুনীর তাঁর চোখ উপড়ে ফেলে, জিহ্বা কেটে ফেলে, পেট চিরে ফেলে। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে খুনীরা তাঁর মৃতদেহের ওপর পৈশাচিক নৃত্যে মেতে ওঠে।

কমরেড সোমেন চন্দ বাংলার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ যাঁর হত্যাকান্ডের সাথে আমি শহীদ তাজুলের হত্যাকান্ডের মিল খুঁজে পাই।
(৬)
২৫টি ছোটগল্প, ‘আগুনের অক্ষর’ এবং ‘বন্যা’ নামে দুটো উপন্যাস, দুটো একাঙ্কিকা, তিনটি গদ্য কবিতার রচয়িতা সোমেন যে বাংলা সাহিত্যের অসামান্য কথাশিল্পী এবং উজ্জ্বল নক্ষত্র, তা তার সাহিত্যকর্মে লক্ষ্য করা যায়, স্বল্পসংখ্যক সাহিত্যভা-ারের জনক হলেও তার গল্পের শিল্পসৃষ্টির জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। তার নির্মম হত্যা সারা দেশের প্রগতিশীল মানুষের মনে প্রচ- আঘাত দিয়েছিল, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিকরা এ হত্যাকে সহজে মেনে নিতে পারেননি। কবি বুদ্ধদেব বসু ‘প্রতিবাদ’ নামে একটা দীর্ঘ কবিতা লেখেন তাকে স্মরণ করে, কবি সমর সেনও কবিতা লেখেন। সোমেনের গল্পের জগৎ থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে একটু আলোচনা করলে দেখব জীবনকে কতটা কাছ থেকে দেখেছেন, সমাজবিজ্ঞানীর চোখ দিয়ে মধ্যবিত্ত জীবনের সমগ্র খুঁটিনাটি বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন। তার সমস্ত গল্প নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায়, নানান রসে নানান উপাদানে ভরপুর, যা সবই জীবন থেকে নেয়া। গল্পের বিষয়ে যেমন চমৎকারিত্বের পরিচয় বহন করে, ব্যাপ্তি বা শিল্পকাঠামো অথবা ভাষাশৈলী সবখানেই সোমেনের স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়।

‘অমর’ শব্দটি যথেচ্ছ ব্যবহারে তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের উৎকৃষ্টতম ও বাছাইকৃত ছোটগল্পের সংকলন করতে গেলে এখনো এবং ভবিষ্যতেও, প্রথম যে লেখকের গল্পকে জায়গা করে দিতে হবে, তাঁর নাম সোমেন চন্দ। কেউ যদি বাংলা ভাষায় গল্প লিখতে আসেন, তাহলে তাঁকে অবশ্যই যে যে লেখকের লেখা পাঠ করতে হবে, সেই লেখকদের অপরিহার্য একজন সোমেন চন্দ।

ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে যে দুটি রাষ্ট্র জন্ম হলো, তার একটি অর্থাৎ পাকিস্তানের অধীন হয়ে বাংলাদেশের মানুষ শাসন-শোষণ ও পীড়নের শিকার হলো।
ভাষা, সম্পদ, স্থাপনা, শিল্প, বাণিজ্য, চাকরি সর্বক্ষেত্রে সীমাহীন যে বৈষম্য দিন দিন এদেশের মানুষকে যেভাবে পিষ্ট করলো তার বিরুদ্ধে প্রগতিমনা মানুষই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুললেন । এ সমস্ত লড়াইয়ের পুরো ভাগে ছিলেন সোমেনের উত্তর সাধকগণ। জহীর রায়হান, শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী প্রমুখতাঁরই রক্তের পরবর্তী ধারা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ সমস্ত লড়াই সংগ্রামে সোমেন চন্দ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্র কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার কোনোটাই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আদৌ দূর হয়নি।

জনজীবনে ঘুষ,দুর্নীতি, মিথ্যাচার, অর্থ লুটপাট ইত্যাদি মানুষের নিয়তি হয়ে উঠেছে। রাজনীতির এমনি ঘৃর্ণাবর্তে পড়ে মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছে। তার সামনে প্রগতিশীল রাজনীতি ও প্রগতিমনা মানুষের বিকল্প ঐক্য প্রয়োজন। সোমেন চন্দ সাহিত্য ও রাজনীতির যে প্রগতিশীল ধারা সৃষ্টি করেছিলেন তা আজ ক্ষীণতোয়া নদীর মতো। মরা নদীতে এখন জোয়ার সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ জন্য সোমেন চন্দের আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে যে প্রগতিশীল বাতাবরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, সেখানে সোমেন চন্দের রেখে যাওয়া অগ্নিমন্ত্রই আবার পথ দেখাবে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরনো পরীক্ষিত দুর্র্নীতিবাজ নয়, মানুষকে নতুন পথের সন্ধান দিতে হবে। এখনো যারা প্রগতিশীলতার কিছু কিছু দীক্ষা নিয়ে পথ চলছেন, তাদের বাতির সলতেটা টেনে তেলের জোগান দিয়ে অগ্নিমশাল জ্বালতে হবে।

(৮)
ইঁদুর’ সোমেন চন্দের শ্রেষ্ঠ গল্প। জীবনের সুক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি, গল্পের কাঠামো নির্মাণ, নির্মাণ শৈলী, ঘরোয়া ও সামাজিক চরিত্র সৃষ্টি এবং গল্পের মুন্সিয়ানা বাংলা গল্পের একটি নান্দনিক অভিযোজন। তাছাড়া ছেঁড়া কাঁথায় পট্টি লাগানোর মতো আমাদের ছিন্নভিন্ন নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনের তিক্ততা ও স্থূলতা, ফুটে উঠেছে ইঁদুর গল্পে। এ গল্পে দেখা যায়, একটি সংসারের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় খুঁটি-নাটি এমন কিছু নেই যা সোমেন চন্দের দৃষ্টিকে এড়িয়ে গেছে– ‘আমাদের বাসায় ইঁদুর এত বেড়ে গেছে যে আর কিছুতেই টেকা যাচ্ছে না। তাদের সাহস দেখে অবাক হতে হয়। চোখের সামনেই, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদলের সুচতুর পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ার মতো ওরা ঘুর বেড়ায়, দেয়াল আর মেঝের কোণ বেয়ে-বেয়ে তর-তর করে ছুটোছুটি করে। যখন সেই নির্দিষ্ট পথে আকস্মিক কোনো বিপদ এসে হাজির হয়, অর্থাৎ কোনো বাক্স বা কোনো ভারি জিসিসপত্র সেখানে পথ আগলে বসে, তখন সেটা অনায়াসে টুক করে বেয়ে তারা চলে যায়। কিন্তু রাত্রে আরও ভয়ংকর। এই বিশেষ সময়টাতে তাদের কার্যকলাপ আমাদের চোখের সামনে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হয়ে যায়। ঘরের যে কয়েকখানা ভাঙা কেরোসিন কাঠের বাক্স, কেরোসিনের অনেক পুরোনো টিন, কয়েকটা ভাঙা পিঁড়ি আর কিছু মাটির জিনিসপত্র আছে, সেখান থেকে অনবরতই খুট-খুট টুং-টুং ইত্যাদি নানা রকমের শব্দ কানে আসতে থাকে। তখন এটা অনুমান করে নিতে আর বাকি থাকে না যে, ঝাঁক ঝাঁক ন্যুব্জদেহ অপদার্থ জীব ওই কেরোসিন কাঠের বাক্সের ওপরে এখন রাতের আসর খুলে বসেছে।’

গল্পের এই শুরুটা ও এর মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রতীকি চেতনায় ইঁদুর গল্প নতুন মাত্রার একটি নবতর সংযোজন। এখানে মা ও বাবার মনোজগৎ, নিম্ন মধ্যবিত্তের অভাব-অনটনপ্রসূত মানসিক যন্ত্রণা, উৎকণ্ঠা, শঙ্কা ও পলায়নপরতা গল্পকে বিন্যাসী এক শিল্পে পরিণত করেছে। এরমধ্যে সন্দেহপরায়ণতা তো আছেই, দরিদ্র ও জীর্ণ একটি সংসারের ইঁদুর মারার কল কেনার পয়সারও সংকট, দারিদ্র্যের এক নির্মম চিত্রায়ন। যা তিনি ভেতর থেকে দেখেছেন। ইঁদুর গল্প মূলত প্রতীকি চেতনাসর্বস্ব। সামগ্রিকভাবে ইঁদুর গল্পের সমালোচনা করতে গেলে বলা যায়, এ গল্পে পুঁজিবাদী সমাজের নিম্নতর শ্রেণির মধ্যে যে আত্মবিরোধ তা ক্ষয়িষ্ণু রূপেরই প্রতিফলন। এছাড়াও সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্গত বিত্তহীন অক্ষম মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দেখানো– তারা সর্বোতভাবে আত্ম-প্রবঞ্চক। তাদের চাওয়া সামান্য কয়েকটা পয়সা, অসহায় স্ত্রী-কন্যা ও পুত্রদের উপর ভোগের উপকরণ স্ত্রীর শরীর, আর বীরত্বের আস্ফালন কয়েকটি ইঁদুর ধরা পড়ায়। ইঁদুরের এই মোটিফটি গল্পের শুরু থেকেই ব্যবহার হয়েছে।

পুঁজিবাদী সমাজের এই নিচের স্তরটির শিরায় শিরায় চলে চোরের আক্রমণ। এ গল্পের মূল চরিত্র সুকু বা সুকুমার এই বৃত্তের বাইরে যাবার পথ কাটে। রেল শ্রমিক সংগঠনে সে দেখে এসেছে নতুন কলে কর্মী মানুষের সংকল্প। গল্পটি ঘুরে এসে আবার বন্দি ইঁদুর ধরার পর্বে উল্লসিত। সোমেন চন্দ ইঁদুর গল্পটি লিখেছেন বেশ আগে। কিন্তু এই ইঁদুর আজকের সমাজেও উপস্থিত। এই ইঁদুর তার তীক্ষ্ম দাঁতে কোথায় না কাটে। ইঁদুর বই কাটে, টাকা কাটে, কাপড় কাটে, সংস্কৃতি কাটে, সাহিত্যকাটে, অর্থনীতি কাটে; লেপ-তোষক-বালিশ সবই কাটে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ইঁদুর দেশও কাটে।
পাঠকদের মধ্যে যাঁরা গল্পটি পড়েননি তাঁরা আমার টাইম লাইনে গিয়ে পড়তে পারেন
তথ্য কৃতজ্ঞতা:
১। সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহ / ড. দিলীপ মজুমদার সম্পাদিত / নবজাতক প্রকাশন /কলকাতা / ১৯৭৩ ২। সোমেন চন্দের বন্যা / ঐ /ঐ / ১৯৭৫
৩। সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্র্হ (২য় খন্ড) / ঐ / ঐ / ১৯৭৫
৪। শিল্পী আক্রান্ত ( সোমেনের জীবনোপন্যাস) / ড. দিলীপ মজুমদার /ঐ / ১৯৯৭
৫। সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহ (অখন্ড) /ঐ /ঐ / ২০০১
৬। সোমেন চন্দের সাহিত্যচর্চা / ড. দিলীপ মজুমদার / ঐ /২০১২
৭) কিছু স্মৃতি কিছু কথা, সরদার ফজলুল করিম;পৃঃ৯৩
৮)অঞ্জন আচার্য (০৮ মার্চ ২০১৬)। “বিপ্লবী সাহিত্যিক সোমেন চন্দ”। এন টিভি অনলাইন
খালিদ
৮ মার্চ ২০১৯/৮ মার্চ ২০২০
Image may contain: 1 person

 

লিখেছেন : Khalid Iftekhar

উৎস : খালিদ ইফতিখার’র পেসবুক ওয়াল।

Three Self-motivational songs of Lalon Fakir

‘Jagoroner Gan’ of Bangladesh liberation war 1971

অমর একুশে’র শহীদ স্মরণে হৃদয়ের মর্মে বাজে যে অপূর্ব গান

একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে -বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিম

প্রখ্যাত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য একবার বাউল শাহ আবদুল করিমকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-

“মানুষ আপনার গান বিকৃত সুরে গায়। আপনার

shah

 সুর ছাড়া অন্য সুরে গায়। অনেকে আপনার নামটা পর্যন্ত বলে না। এসব দেখতে আপনার খারাপ লাগে না…?”

শাহ আবদুল করিম বললেন-
“কথা বোঝা গেলেই হইল…

আমার আর কিচ্ছু দরকার নাই…”

কালীপ্রসাদ ভট্টাচার্য আশ্চর্য হয়ে বললেন-
“আপনার সৃষ্টি… আপনার গান। মানুষ আপনার সামনে বিকৃত করে গাইবে। আপনি কিছুই মনে করবেন না… এটা কোন কথা… এটার কোন অর্থ আছে…?”

শাহ আবদুল করিম বললেন-
“তুমি তো গান গাও…
আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো…
ধর তোমাকে একটা অনুষ্ঠানে ডাকা হলো। হাজার হাজার চেয়ার রাখা আছে কিন্তু গান শুনতে কোন মানুষ আসে নাই। শুধু সামনের সারিতে একটা মানুষ বসে আছে…

গাইতে পারবে…? “

কালীপ্রসাদ কিছুক্ষন ভেবে উত্তর দিলেন-
“না… পারবো না…”

শাহ আবদুল করীম হেসে বললেন-
“আমি পারবো…

কারণ আমার গানটার ভেতর দিয়ে আমি একটা আদর্শকে প্রচার করতে চাই। সেটা একজন মানুষের কাছে হলেও। সুর না থাকুক… নাম না থা

কুক… সেই আদর্শটা থাকলেই হলো। আর কিছু দরকার নাই… সেজন্যই বললাম শুধু গানের কথা বোঝা গেলেই আমি খুশি…”

কালীপ্রসাদ ভট্টাচার্য জানতে চাইলেই-
“সেই আদর্শটা কি…?”

শাহ আবদুল করীম আবার হেসে বললেন-
“একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে…”

‘এই পৃথিবী একদিন বাউলের পৃথিবী হয়ে যাবে’।

এ কথাটা বলেছিলেন শাহ আব্দুল করিম। এবং উনার চোখে যে বিশ্বাস, মানে যুগ যুগ ধরে… আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমাদের দেশের কোনো রাষ্ট্রপতি কোনো প্রধানমন্ত্রীর চোখে এই বিশ্বাস নেই।… আমরা অনেক নেতাদের মুখে অনেক কথা শু

নি, কিন্তু তারা বিশ্বাসে বলেন না কথাগুলো। তারা বলতে হয় বলে বলেন, নয় নিজের স্বার্থে বলেন, নয় লোককে ভুল বুঝানোর জন্য বলেন।…”

– কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য

দেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাথে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে তিনি বলেন,

‘ হুমায়ূন সাহেব অত্যন্ত জ্ঞানী-গুণী মানুষ। আমি তাঁকে শ্রদ্ধাও করি। আমাকেও তিনি শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। একবার তিনি টিভিতে

একটি অনুষ্ঠান বানানোর জন্য একজন লোককে আমার কাছে পাঠালেন। প্রচার আমি কোনোসময়ই চাইনি, তখনো তা-ই করেছিলাম। কিন্তু লোকটির চাপাচাপিতে ঢাকা গেলাম। হুমায়ূন সাহেব আমার সাক্ষাত্কার নেওয়ালেন, গান গাওয়ালেন। আমি ফিরে আসার সময় উনি সৌজন্যসাক্ষাত্টুকু পর্যন্ত করলেন না, গাড়ির ড্রাইভারকে দিয়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন। আমার হাসি পেল। এই টাকার জন্য কি আমি এতদূর ঢাকা ছুটে গিয়েছিলাম? আমি হাওরের বনে-বাদাড়ে বড় হয়েছি, মনটা সে রকমই বড়। টাকা আমার কাছে কিছুই না। এই করিম টাকার ধান্ধা করলে এতদিনে অনেক বড়লোক হতে পারত! কই, কখনো তো টাকার পেছনে ছুটিনি। এ ঘটনাটি আমাকে খুব পীড়া দেয়। পরে অনুষ্ঠানটি প্রচারের তারিখও তিনি আমাকে জানাননি। সে ঘটনাই আমি সাক্ষাত্কারে বলেছিলাম। পরে আর কখনো হুমায়ূন আহমদের কাছে যাইনি। সত্য কথা বলার কারণে যদি সম্পর্কের অবনতি হয়ে থাকে—তাতে তো আমার আর কিছুই করার নাই।’

ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানবোধ কাকে বলে বাউল দেখিয়ে গিয়েছেন।

আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি। এইদিনে জন্মেছিলেন ভাটির সুরের জাদুকর শাহ আবদুল করিম।

‘এত সংবর্ধনা, সম্মান দিয়ে আমার কী হবে? সংবর্ধনা বিক্রি করে দিরাই বাজারে এক সের চালও কেনা যায় না। পেটে যদি ভাত না থাকে করিম মেডেল গলায় দিয়ে কী করবে?’

স্পষ্টতায়, স্পর্ধায় কাটিয়েছেন এক বাউল জীবন।

ছিলেন রাখাল বালক। স্কুলে কয়েকদিন মাত্র গিয়েছেন। সারাজীবন দরিদ্রতার সাথে লড়াই করেছেন। বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন প্রিয়তমা স্ত্রী সরলা। তবু গান ছেড়ে যান নি করিম। বরং এইসব প্রতিকূলতা তাকে আরো দৃঢ়চেতা করেছে।

ঈদের নামাজে গেছেন। এক মুরুব্বি তাকে দেখেই বললেন, ‘করিম ইসলাম ধ্বংস কইরা ফালাইতাছে। গানবাজনা ইসলামে হারাম, এরপরও সে গান গাইতাছে। এইটার বিহিত করা দরকার’। তিনি ইমাম সাহেবকে সামনে রেখে সব মানুষের সামনে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গান গাওয়া ইসলামে হালাল কি না?’ ইমাম সাহেব বললেন—’গানের সুরে যদি আল্লাহকেও ডাকে, তাহলেও গুনা হবে’। ব্যাস, আর যায় কই? ওই মুরুব্বি তাকে জিজ্ঞেস করলেন—গান ছাড়ব কি না?তিনি বললেল—সেটা কখনোই আমি পারব না। উত্তর শুনে ওই মুরুব্বি মানুষটি রেগে গেলেন। তিনি বললেন

, ‘এত স্পর্ধা, ইমাম সাহেব ও মুরুব্বিদের মুখের ওপর কথা। সেটা মেনে নেওয়া যায় না।’ এরপর তিনি বললেন, ‘এখন বললাম গান ছেড়ে দেব, পরে ছাড়লাম না। তাই এ ধরনের মিথ্যা কথা আমি বলতে পারব না। নিজে যা বিশ্বাস করি, তা-ই বলেছি। আপনার যদি এ কারণে আমাকে গ্রামে জায়গাও না দেন, তাতেও আমি রাজি।

এরপর থেকে প্রায় প্রতি শুক্রবারে জুম্মার নামাজের আগে-পরে মসজিদে মুসল্লিরা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে—গান-বাজনা করে আমি নাকি বেশরা কাজ করছি। তখন গ্রামের আশপাশে সারারাত ধরে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল।

 সেই ওয়াজে দেশের বিশিষ্ট ওয়াজিরা এসে আল্লা-রসুলের নাম না-নিয়ে উনা শ্রাদ্ধ করার কাজে যোগ দিয়েছিল। রাতভর অকথ্য ভাষায় তাকে গালিগালাজ করত। শেষে একসময় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে গ্রাম ছাড়েন।

গানের জন্য তাকে ধর্মজীবীরা একঘরে করেছে, স্ত্রী সরলা আর শিষ্য আকবরের জানাযায় অংশ নেয় নি এলাকাবাসী।

শাহ আবদুল করিম লালনের সুযোগ্য শিষ্য। কেন? কারণ-শাহ্ আবদুল করিম তাঁর স্ত্রীকে মনে করতেন মুর্শিদ। ‘মুর্শিদ’ শব্দটার অর্থ-নেতা (আধ্যাত্মিক অর্থে অবশ্য)। শাহ আবদুল করিমের স্ত্রীর নাম ছিল আবতাবুন্নেছা। করিম আদর করে ডাকতেন: ‘সরলা।’

স্ত্রীকে ‘মুর্শিদ’ মনে করাটা সহজ নয়। অনেক শিক্ষিত আধুনিক পুরুষও এক্ষেত্রে পিছিয়ে। কেন? ঈশ্বর পুরুষ বলেই?। করিম কেন পারলেন? করিম বাউল বলেই পারলেন। বাউল বাংলার ধর্ম- বাংলা মাতৃতান্ত্রিক বলেই।

বাউলের স্ত্রী সরলা মারা যাওয়ার পর গ্রামের ইমাম সাহেব বললেন—’বাউলের স্ত্রীর জানাজা পড়ানোর দরকার নাই।’ আবার তার প্রিয় শিষ্য আকবর মারা যাওয়ার পর মসজিদের মাইকে তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করেনি। তার দোষ, সে বাউলের সঙ্গে থেকে গানটান গেয়ে নাকি বেশরা ও ইসলামবিরোধী কাজ করেছে। তাই সে বাউলের মতোই কাফের হয়ে গেছে। তিনি বলেন,’বেতনভোগী ইমামের কথা শুনে আর রাগে-দুঃখে নিজেই আমার বাড়িতে কবর খুঁড়েছি। আকবরের জানাজা পড়িয়ে দাফন করেছি। গ্রামের কেউ কেউ আইছিল, কেউ কেউ আয়ে নাই।’

বাড়ির কাছে উজানধল বাজার। চাল আনতে সেখানে গেছেন তিনি। ফিরে এলে চুলো জ্বালাবেন— এ অপেক্ষায় বসে রইলেন গিন্নি। সামান্য সময়ের ব্যাপার এ বাজারসদাই। অথচ ঘণ্টা পেরিয়ে দিন যায়, সপ্তাহ পেরোয়। অবশেষে ১৮ দিন পর খবর পাওয়া গেল তিনি আছেন হবিগঞ্জে। এক ভক্তের বাড়িতে গান করছেন। এমনই খেয়ালি মানুষ ছিলেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম।

শাহ আবদুল করিম শুধুমাত্র বাউল ছিলেন না, তিনি একাধারে গণসংগীত শিল্পীও। সারাজীবন শোষিত বঞ্চিতদের পক্ষে গান লিখেছেন। তাঁর আঘাতের লক্ষ্য ছিলো ভণ্ড রাজনীতিবিদ, শোষক, পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদ। ধর্মের অপব্যবহার তো অবশ্যই।

শাহ আবদুল করিমের গানে বৈষ্ণব ধারার মীড়াশ্রয়ী সুরের ঝংকারের সঙ্গে সুফী ধারার গতিপ্রধান ছন্দের সম্মিলন ঘটেছে।

শাহ আব্দুল করিম রচিত পাঁচশতাধিক গানে যেমন সিলেটের ঐতিহ্য ও শিকড়ের সন্ধান মেলে তেমনি বৈষ্ণব-সুফী ধারার সাধন-ভজনের পরিচ

য়ও পাওয়া যায়। একদিকে বাস্তবজীবনের কঠিন কঠোর পথপরিক্রমা অন্যদিকে জগত-জীবন সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণ, সৃষ্টির রহস্য নিয়ে কৌতূহল শাহ আব্দুল করিমকে করে তুলেছে বাউল মরমী।

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের পূর্বসূরি মরমি সাধকরা তত্ত্বকথা বলে গেছেন। সমাজে সাম্য সৃষ্টির আন্দোলন করেছেন। কিন্তু শাহ আবদুল করিমের বৈশিষ্ট্য

 ভিন্ন মাত্রার। দেশের, দশের, জনগণের, সমাজের দুঃখ-দুর্দশার কথা তিনি তাঁর রচনায় উল্লেখ করে ভিন্নধর্মী সংগ্রাম করেছেন।

শাহ আবদুল করিম কাগমারী সম্মেলনে গান করে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাদের শ্রদ্ধা আদায় করে নেন।শাহ

আবদুল করিম বেড়ে ওঠার সময় লোক সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল পরিবেশ ছিল। শাহ আবদুল করিম ৫৪’র নির্বাচন ৬৯,এর গণ আন্দোলন, ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি পর্যায়ে স্বরচিত গনসঙ্গীত পরিবেশন করে জনতাকে দেশ মার্তৃকার টানে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর গণসঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে মাওলানা আবদুল হামিদ থান ভাসানী তাঁর পিটে হাত রেখে বলেছিলেন-বেটা, গানের একাগ্রতা ছাড়িও না, তুমি একদিন গণ মানুষের শিল্পী হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণসঙ্গীত শুনে এক

শ পচাশি টাকা দেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১১ টাকা দিয়ে বলেন, তোমার মতো শিল্পীকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়া হবে।

তার লেখা বইগুলো হচ্ছে- ‘আফতাব সঙ্গীত’ (আনু. ১৯৪৮), ‘গণসঙ্গীত’ (আনু. ১৯৫৭), ‘কালনীর ঢেউ’ (১৯৮১), ‘ধলমেলা’ (১৯৯০), ‘ভাটির চিঠি’ (১৯৯৮), ‘কালনীর কূলে’ (২০০১) ও ‘শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র’ (২০০৯)।

শুধু সুরের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে তাঁর কাছ থেকে বাহবা কুড়িয়ে নেয়ার লক্ষ্য আর সাধারণ গায়কের মতো ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি থাকতেন বলেই তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সুখ-দুঃখের সাথে তাঁর গভীর পরিচয় ছিল। তাঁর গানের কথা বা ভাষাগুলো তাই প্রমাণ করে। তাঁর গানের মধ্যে সাধারণ মানুষেরই চাওয়া-পাওয়ার সুরই বেজে উঠেছে।

“কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া
আমি ফুল, বন্ধু ফুলের ভ্রমরা

সখী গো আমি ফুল, বন্ধু ফুলের ভ্রমরা।”

একবার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন- ‘আমি বেহেস্ত, দোজখ চাই না। জীবিত অবস্থায় আমার ভাটি অঞ্চলের বিপন্ন মানুষের সুখ দেখতে চাই। ওই মানুষগুলোর সুখ যারা কেড়ে নিয়েছে আমার লড়াই তাদের বিরুদ্ধে। একসময় তত্ত্বের সাধনা করতাম, এখন দেখি তত্ব নয়, নিঃস্ব-বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, আর সোনার বাংলা সো

নার বাংলা করলে হবে না। লোভী, শোষক, পাপাত্মাদের আঘাত করতে হবে।’

‘বসন্ত বাতাসে সইগো
বসন্ত বাতাসে
বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ
অামার বাড়ি অাসে
সইগো বসন্ত বাতাসে…’

-বাউল শাহ আব্দুল করিম

একবার তিনি রেডিও’র একটা চেক ভাঙ্গাতে গেলেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। আব্দুল করিমের পরনে ছেঁড়া পাঞ্জাবি। তাকে দেখে ব্যাংকের কেউ কি ভেবেছে কে জানে! কিন্তু আব্দুল করিম ভীষণ অপমানিত বোধ করেছেন। তিনি বিলাতে গান গাইতে গিয়েছেন। সেখানে দেখেছেন

, মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু নিজের দেশে দেখলেন এখানে মানুষের মর্যাদা পদ পদবিতে, পোষাকে, চেহারায়। সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন,

আমার পাঞ্জাবি ছেঁড়া তো কি হয়েছে, আমি কি এই দেশের নাগরিক না? আমার লুঙ্গিতে নাহয় তিনটা তালি বসানো, কিন্তু আমি তো ট্যাক্স ফাঁকি দেই নাই কখনো। তাহলে এত ব্যবধান, এত বৈষম্য কেন? মানুষ তো মানুষের কাছে যায়। আমি তো কোনো বন্যপশু যাইনি। বন্যপশুরও অনেক দাম আছে, এদেশে মানুষের কোনো দাম নেই, ইজ্জত নেই।

বসন্তে জন্মছিলেন বলেই হয়ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মাটির গন্ধ গলায় তুলে নিয়েছিলেন বাউল শাহ আব্দুল করিম।লাল সবুজের সুরের ডাক নাম শাহ আব্দুল করিম।

একজন স্বশিক্ষিত কবি। তার চেতনাই তার সৃজনের জ্ঞানশিক্ষা। বাংলার মাটি, জল, সবুজ, সুন্দরমা প্রকৃতিই তাঁর পাঠশালা। সেই পাঠশালার চিত্রছায়ায় পাঠ নিতে নিতে তিনি অনুধাবন করেছেন জীবনকে, জীবনের একক নিয়ামক শক্তিকে।তাইতো তিনি অকপটে বলতে পারেন, ‘কেউ বলে দুনিয়া দোজখ, কেউ বলে রঙের বাজার / কোনো কিছু বলতে চায় না, যে বুঝেছে সারাসার।’

সবচেয়ে বড় পুরস্কার বোধহয় মানুষের ভালোবাসা। শাহ আবদুল করিমের গান মানুষের মুখে মুখে। আরও হাজার বছর বেঁচে থাকবে তার গান। তার গান গেয়ে অনেক শিল্পী জনপ্রিয় হয়েছেন। ভবিষ্যতেরও হবে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বহুল চর্চা হচ্ছে তার গান। একজন সুর সাধকের জন্য এরচেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে।

জন্ম যার মানবকে সুরের টানে নিজের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনা.

লেখক : স্নেহশীশ লেনিন

উৎস : স্নেহশীশ লেনিন এর ফেসবুক ওয়াল থেকে