হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার ’সৃষ্টি’ কম্পেজিশন’টা শুনলে আপনি বিগব্যাং থিউরির অনুভূতি পাবেন।

হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার ’সৃষ্টি’ কম্পেজিশনটা শুনলে আপনি বিগব্যাং থিউরির অনুভূতি পাবেন। যদিও কম্পেজিশনটা বেইজড় অন ক্লাসিক্যাল। কিন্তু আপনে কান খোলা রাখলে নিশ্চিত বিগ ব্যাং থিউরির অনুভূতি পাবেন। ওস্তাদের চরণে নত হয়ে এবং গুরুজনদের শ্রদ্ধভক্তি জানিয়ে- আসুন আমরা জার্নিটা শুরু করি:

এ কম্পোজিশনের শুরুতে আমাদের সাউন্ড ইফেক্টের মাধ্যমে একটা টাইমলাইনের মধ্যে প্রবেশ করাবে-যেমন বিগব্যাং হবার পরে সময় যাত্রা শুরু হয়েছে, ঠিক তেমনি। একই সাথে হারমোনিয়ামের খাদে নামা স্বরের বেইজের উপরে বাঁশি খুব নিছু (স্বরের উচু-নিছু মানে-মোটা স্বরকে বলে নিছু আর চিকন স্বরকে বলে উঁচু) থেকে ভয়ার্তভাবে স্বরের উঠা-নামার মাধ্যমে এবং পরে করুন আর্তি মাখিয়ে কেউ/কিছু যেনো তার সঙ্গীকে কাছ আসার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু সঙ্গী সহজে আহ্বানকারীকে পাত্তা দিচ্ছে না। এবার আরেকটা সুর যন্ত্রের আবির্ভাব ঘটবে-সেটা হলো গীটার। সেটা একই সাথে সুর এবং বিটের কাজ করে বাঁশিকে আরো আবেদনময় করে করে তুলবে। এবার বাশি স্বরের উঠানামা এবং দক্ষ ইম্পোভাইজেশনের মাধ্যমে অনুনয়- বিনুনয়, আকুতি-মিনতি, কারিস্মা-কাবিরাজি, যাদু-সার্কাস দেখানো শুরু করবে (যেটাকে ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকে ’আলাপ’ ও জোড বলে) এবার সঙ্গীটির মন গলবে।

কোন কিছু সৃষ্টির জন্য দুইটা জিনিসকে একসাথ হওয়া লাগে। এর পরই না তারা সৃষ্টির খেলায় মেতে ওঠে। তো সঙ্গীটি কাছে আসবে এবং কাছে আসার বার্তাটি আমরা পাবো বাঁশির স্বরের পরিবর্তন ও বিট রিদমের আগমনের মাধ্যমে। কঙ্গো নামক একপ্রকার  আরদ্ধ বাদ্যযন্ত্র (আনদ্ধ যন্ত্র বিষয়টা একটু খোলাসা করি-যেসব যন্ত্রের চামড়ার উপর টোকা/আঘাত দিয়ে শব্দ ছন্দ এবং তাল তৈরী করা যায় সেগুলা, যেমন ঢোল,খোল,তবলা,পাখোয়াজ,কঙ্গো,বঙ্গো,ডুগি,ডুগডুগি ইত্যাদি।)  যাক, যে যন্ত্রের কথা বলতেছিলাম, ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকে ঢোল,খোল,তবলা,পাখোয়াজ বাজে. কিন্ত কঙ্গো প্রায় বাজেই না। ’সৃষ্টি’ কম্পোজিশনের বিশ্বময়তার আবেদন তৈরীর জন্য এটা এবং গীটার যন্ত্র্র ব্যবহার করা হয়েছে। একই সাথে আগমন ঘটে বীনা’র। বীনা যন্ত্র ছোট ছোট মিষ্টি মিষ্টি ওয়েভ তৈরীতে খুব দক্ষ। কঙ্গো বাজতে থাকে আট মাত্রার কার্ভা তালে, কিন্তু বীনা বাজতে থাকে তিনতালের ডাবল লয় এ। ষোল মাত্রার তিনতালকে ডাবল ফোর্সে বাজালে তো আট মাত্রাই হয়, কিন্তু একই সাথে তিনতালের বৈচিত্রও বজায় থাকে।

বীনা’র এ ওয়েভ আমাদের মনে কবিয়ে দিতে চায় যে, মহাবিশ্বের সর্বত্র আমি ছড়িয়ে আছি। আমি আছি মেটালও আছে। কারণ মেটালের সাথে ইন্টারএ্যাকশন না হলে আমার কোন দাম নাই। আমি তখন শুধুই ওয়েভ হিসেবে থাকবো,আমার  রিদমটা এমন সুমিষ্ট থাকবে না। পরে আমরা হকিং থেকে জানতে পারি যে, মহাবিশ্বে ফাঁকা জাগয়া  বলে কিছু নেই। সব জায়গা বস্তুনিচয় ও ওয়েভে পরিপূর্ণ। এ কারণে সব স্থান থেকে বিকিরণ হয়। বস্তু আছে তো বস্তুর সংঘর্শও আছে এবং বিকিরনও আছে। কৃষ্ণ বিরবও কালো নয়, সেখান থেকেও বিকিরণ হয়। এর প্রচন্ড শক্তিশালী আকর্ষন শক্তি আলোক তরঙ্গকে বাঁকিয়ে দেয় বলে আমরা তা দেখি না। যাই হোক, এ কয়েকটা যন্ত্র একসাথে বাজাতে থাকে। তার উপর এবার বাঁশিতে বিলম্বিত একটা ধুন বাজে। (ধুন-কোন গান বা মিউজিকের মূখ বা স্থায়ীটা যখন ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে-সেটাই। আমরা কারো সম্পর্কে বলি না,-লোকটা ধুনপুন করছে! -মানে একই কথা বার বার বলছে) এটাকে শাস্ত্রীয় সংগীতে –বিস্তার বলে। আমরা বুঝতে পারি তারা দু’য়ে মিলে সৃষ্টির খেলায় মেতে উঠেছে। আমরা জানি যে, বিগ ব্যাং হবার কয়েক সেকেন্ড পরে কয়েক ধরণের বস্তুকনা বা পার্টিকেল তৈরী হয়। সবচাইতে বেশি যেটা তৈরী হয়-সেটা লেপটন এবং প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক এন্টিলেপটন। এবার বাঁশি-তবলা এবং বীনা’র একটা তুমুল তর্কা-তর্কির মিউজিক -জবাবী সংগীত হয়। বাঁশিতে যা বাজে বীনা ও তবলা  তার উচিত জবাব দেয়, জবাবী সংগীত পর্বের চুডান্ড পর্যায়ে যখন যায় তখন মনোযোগ দিলে আমরা বুঝতে পারি, তাদের মধ্যে যেমন-লেপটন ও এন্টিলেপটন-সংঘর্ষ হচ্ছে এবং তারা সংঘর্ষে উভয়ে ধ্বংশ হয়ে যাচ্ছে। জবাবী সংগীত উত্তঙ্গ পর্যায়ে গিয়ে হঠাৎ কার্ট হয়ে  গেলে স্তব্ধতা নেমে আসে। আমরা বুঝতে পারি ততক্ষণে লেপটন এবং এন্টিলেপটনগুলো সংঘর্ষে ধ্বংশ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যে লেপটনগুলো ছিলো সেগুলো একত্রিত হয়ে বিশাল ওয়েব এর তুলনায় অল্প পরিমান সলিড মেটাল/স্পেস তৈরী হয়েছে। এটা আমরা বুঝতে পারি-বাঁশি যখন তার বিলম্বিত ধুনে আবার ফিরে যায়, এবং একটার জায়গায় দুইটা বাঁশি বাজে-তখন। কম্পোজিশনটির শেষের দিকে আবার শুরুর সাউন্ড ইফেক্টটি ফিরে আসে আমাদের টাইমলাইন জার্নি থেকে বের করে নিয়ে যায়।

পরিশিষ্টঃ প্রখ্যাত যাদুশিল্পি এবং বংশীবাদক জুয়েল আইচের নেয়া সাক্ষাৎকারে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া সে সময়ের কম্পোজিশনগুলো নিয়ে কথা বলছিলেন-সাক্ষাৎকারটা দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ বাংলায়। তিনি অন্নপূর্ণা দেবীর শিষ্য হিসেবে এবং ওড়িষ্যায় কটক বেতারে ১৯৫৭ সাল থেকে চাকরী করার ফলে বাংলাটা ভালোই জানেন। সে সময়ের কম্পেজিশন সম্পর্কে তিনি বলেছেন–প্রথমে রেকর্ড কোম্পানীগুলো এ ধরণের এ্যালবাম করার জন্য রাজি হচ্ছিলেন না- লোকসান হবে ভেবে। পরে তারা প্রস্তাব দিয়েছেলেন, কয়েকজন মিলে যদি এটা করেন তাহলে আমরা রাজি আছি। পরেরটা ইতিহাস; কম্পিজিশনগুলো এতই জনপ্রিয় হয়েছিলো যে,অল্পদিনেই সব লংপ্লে ডিস্ক/ক্যাসেট শেষ হয়ে যায়।

এ্যালবামের নাম : Eternity

বাঁশি (Bamboo flute): Pt. Hariprasad Chaurasia

কম্পোজিশন : দুটি,1. ‍Srishti and 2. Mukti

প্রকাশকাল : 1985,প্রকাশক কোম্পানী: His Master’s Voice

লাইনার নোট বা নির্দেশনা : Raghava R. Menon

একটা বৈশাখী গানের আইডিয়া মাথার মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে ছিলো, সময়ের অভাবে দেরীতে হলোও বৈশাখী গানটা বাঁধলাম।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মাসে রুনা লায়লার কন্ঠে চীর অমলিন ভাষার গান ও দেশের গান

ভিনদেশী তারা : চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ড

আমার ভিনদেশী তারা

একা রাতেরি আকাশে

তুমি বাজালে একতারা

আমার চিলেকোঠার পাশে।

ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে

 তোমার নাম ধরে কেও ডাকে

 মুখ লুকিয়ে কার বুকে

 তোমার গল্প বলো কাকে।

আমার রাতজাগা তারা

 তোমার অন্য পাড়ায় বাড়ি

আপনার ভয় পাওয়া চেহারা

আমি আদতে আনাড়ি।

আমার আকাশ দেখা ঘুড়ি

কিছু মিথ্যে বাহাদুরি

আমার চোখ বেঁধে দাও আলো

দাও শান্ত শীতল পাটি

তুমি মায়ের মতোই ভালো

আমি একলাটি পথ হাটি।

আমার বিচ্ছিরি একতারা

তুমি নাওনা কথা কানে

তোমার কিসের এত তাড়া

রাস্তা পার হবে সাবধানে।

তোমার গায়ে লাগে না ধূলো

আমার দুমুঠো চালচুলো

রাখো শরীরে হাত যদি

আর জল মাখো দুহাতে।

প্লিজ ঘুম হয়ে যাও চোখে

আমার মন খারাপের রাতে।

আমার ভিনদেশী তারা

তোমার আকাশ ছোঁয়া বাড়ি

আমি পাইনা ছুঁতে তোমায়

আমার একলা লাগে ভারি।

পান করি মেধার গলিত সুধা বিষন্নতা

৫০ পছর

সহাশয়েরা,

৫০ বছরের বান-তুফান-ভাঙ্গন কবলিত আমরা ভিটা-মাটি হারিয়ে

দক্ষিণের চরলাঙ্গলিয়া,উরিরচর,মুলফৎগঞ্জ,কালাবগী থেকে আপনাদের এ আলো ঝলোমলো নগরে এসেছি,

আমরা এসেছি উত্তর বঙ্গের রাজারহাট,রৌমারী,ভূরুঙ্গামারী থেকে ৫০ বছরের মঙ্গার দারুন ক্ষুধা নিয়ে।

কেউবা এসেছি রাঢ়ের হাহা করা মাঠ পেরিয়ে ৫০ বছরের ক্ষুধা-তৃষ্ণা বুকে নিয়ে।

পাহাড় থেকে এসেছি কেউ কেউ ৫০ বছরে জুমের টিলা হারিয়ে, দীর্ঘ নিবর্তনের জ্বালা বুকে নিয়ে,

কেউবা এসেছি সম্ভম হারিয়ে।

আপনারা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছেন, উন্নয়নের জোয়ারও নাকি বইছে দেশে!

সেসবের কোন দাবী আমরা করবো না, খাদ্য-বস্ত্রের দাবীও নেই আমাদের।

অতি সামান্য একটি দাবী নিয়ে আমরা এসেছি আপনাদের কাছে,

দেশে শহীদদের স্মরণে নির্মিত যে স্মৃতি সৌধ, যেসব শহীদ মিনার আছে-সেখানে আমাদের একটু ঠাই দিন,

পাখিরা যেমন খড়-কুটো নিয়ে বাসা বাধে, তেমনি আমরা বাসা বাঁধতে চাই ওখানে,

আশ্রয় পেতে চাই শহীদের স্মৃতির ঘনিষ্ঠতায়, কাটিয়ে দিতে চাই বাকীটা জীবন।

পান করি মেধার গলিত সুধা বিষন্নতা

দিনের আলোতেও দেখি সূর্যটা পড়ো  ম্রিয়মান

ভরা পূর্ণিমায় দেখি কুয়াশায় ঘোরলাগা রাতের আকাশ

তবে কারা লুট করে নিয়ে যায় সূর্যের আলোর ফোয়ারা

মহীনের ঘোড়াগুলো প্রদোষের মাঠে এলে উবে যায় ঘাস।

আঁধারে করাতকল বৃক্ষরাজির দিকে সদা ধাবমান

আমার হৃদয় চিরে কারা যেনো দু’ফালি করছে বারবার

স্তব্ধতার অনুবাদ প্রহর গুনে করে যায় পক্ষীকূল

স্বাক্ষীর চোখে চায় দ্রুবতারা, নিঃকম্প রাতের আসমান।

পিঁপিলিকা জানে ঠিক আকালের আপদ-বিপদ ধবনি

মানুষেরা ভাসে গরিমায় তবু জানে না সে পতংগের ভাষা

তারো আধিক জেনে আরোণ্যক বৃক্ষরাজি ধ্যানমগ্ন স্থির

বিদূষক বাড়িয়ে চলে অবোধের নিরন্তর পণ্য’র পিপাসা।

অথচ যাদের দগ্ধ পাকস্থলী তীব্র দহনে কাটে কাটে রাত

বিপুলা পৃথিবী, নুনের চামুচ কেন তোমার ঐশ্বর্যময় হাত!

-মশিউর রহমান মিঠু